খালেদদা-কে খোলা চিঠি

খালেদ চৌধুরীর জীবন ও সৃষ্টি নিয়ে বিগত কয়েক বছর ধরে যিনি পরম নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করে চলেছেন, সেই প্রদীপ দত্ত এবার কলম ধরলেন উদ্ভাস-এর জন্য।

শ্রদ্ধেয় খালেদদা,

আজ এক মাস হয়ে গেল আপনি আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। আপনার শেষ ইচ্ছানুযায়ী আমরা চেষ্টা করেছি আপনার কথা রাখতে। আকাডেমি বা অন্য কোথাও আপনার দেহটাকে নিয়ে যেতে দিইনি আমরা। নার্সিংহোম থেকে সোজা নীলরতন সরকার হাসপাতালের অ্যানাটমি ডিপার্টমেন্টের টেবিলে শুইয়ে রেখে এসেছি আপনাকে। গণদর্পনের ব্রজ রায় নিজে উপস্থিত ছিলেন সেখানে। খালেদদা, তার আগে আপনার চোখ দুটো সংগ্রহ করে নিয়ে গেছে শুশ্রুত আই ফাউন্ডেশন থেকে। আপনার ধারণা ছিল আপনি যেহেতু চোখে দেখতে পেতেন না ভালো করে তাই ও-দুটো আর কাজে লাগবে না। না খালেদদা, আপনার দুখানা চোখ দিয়ে আজ দু-দুজন মানুষ অন্ধকার থেকে আলোর জগতে আসতে পেরেছে। আপনি তো আমাদের সকলকেই আলো দেখাতে চেয়েছিলেন। আমরাই পারিনি সেই আলোর পথযাত্রী হতে।Odishar Mondir Chitro

এখন কোথায় আছেন খালেদদা? ভীষণ জানতে ইচ্ছা করে। আপনি প্রায়ই মজা করে বলতেন, ‘নাস্বনান’-এ জায়গা হলে সেখানেই থাকব’। নাস্বনান মানে ‘না স্বর্গ না নরক’। স্বর্গ আর নরকের মাঝামাঝি জায়গায় এমন একটা করিডরের কল্পনা আপনার ‘জর্জদা’-র। এই নিয়ে খুব সুন্দর একটা গল্প বলেছিলেন আপনি। যেখানে দেবব্রত বিশ্বাস তাঁর গুরুদেব অর্থাৎ রবীন্দ্রনাথের সাথে থাকার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন। পেলেন সেখানে জায়গা? না কি সেখানেও খুব ভিড়? আপনার তো আবার ভিড়ের মাঝে থাকতে ঘোর আপত্তি।

মনে আছে, নার্সিংহোমের বিছানায় শুয়ে বেডসোরের অসহ্য যন্ত্রণাকে উপেক্ষা করে হাসতে হাসতে আমাকে কি বলেছিলেন? বলেছিলেন, ‘আমি নরকেই যাব’। কারণ জানতে চাইলে শুকনো ঠোঁটের কোনে হাসি ফুটে উঠেছিল। আপনার স্বভাবসুলভ ভঙ্গিমায় বললেন, ‘স্বর্গে ভীষণ ভিড়। সবাই পুজো-আচ্চা করে, চোর ডাকাতও পূণ্যি করে গঙ্গাস্নান করে। দেখ না, সব ব্যবসায়ীরা, নেতা মন্ত্রীরা গাদা গাদা পাপ করে চলে যায় কুম্ভমেলায় নয়তো গঙ্গাসাগরে। কেউবা আবার হজ করতে। ব্যাস্, ওদের পাপ মকুব। ওরাও সগ্গে যাবে। অত ভিড় ভারাক্কা আমার পোষাবে না। আমি পুজোও করিনি, গঙ্গাস্নান অথবা নামাজ পড়া কোনটাই করিনি সুতরাং নরকেই। নরকে কি আর হবে, একটু গরম তেলের কড়াইতে ছানচা দিয়ে ভাজবে নয়তো বরফের স্ল্যাব-য়ের ওপর শুইয়ে রাখবে। ক্ষানিকক্ষণ জ্বালা করবে তারপর সয়ে যাবে। যমদূতেরাও বিরক্ত হয়ে হাল ছেড়ে দেবে। এখানে ওর চেয়ে আর কমটাই বা কি হচ্ছে।’

THEMA BOOK OF NAXALITE POETRY mail 1     জানি, আপনি সব যন্ত্রণা সহ্য করতে পারবেন। যন্ত্রণাতো আপনার সঙ্গী সেই শৈশব থেকেই। কোন ছেলেবেলায় মা-এর মৃত্যুমুহুর্তে তাঁর ডাকে পাশে যেতে পারেননি বাবার ভয়ে। সে কি কম যন্ত্রণার! বাবার হাতে মাকে নিগ্রহ হতে দেখা আর নিজেকে যে অমানবিক অত্যাচার সহ্য করতে হয়েছে ছেলেবেলা থেকে, যন্ত্রণা তো সেখান থেকেই অভ্যাসে পরিণত হয়ে গেছে, তাই না? তারপরে ঘর ছেড়ে পালাবার সময় কত রকমের যন্ত্রণা। মনে পড়ে, সেই সাত সাতটা দিনের কথা? সিলেটের সেই গঞ্জ এলাকা, আম্বরখানার কথা? ওইখানেই একটা মসজিদে পৌষমাসের ঠান্ডায় একটা জামা আর পায়জামা পরে একেবারে অভুক্ত অবস্থায় সাতটা দিন-রাত শুধুমাত্র পুকুরের জল খেয়ে কাটাবার শক্তি কোথা থেকে অর্জন করেছিলেন ঐটুকু বয়সে!

‘যন্ত্রণা’ আপনার পরীক্ষা নিতে নিতে ক্লান্ত হয়নিতো একটুকু? না হলে ভাবুন সেই দিনটার কথা, ১৯৪৬ সালের সেই যেদিন ‘শহিদের ডাক’ করে তিন মাস পর কলকাতা ফিরলেন। পাম প্লেসের বাড়িতে বর্ষার জল ঢুকে আপনার সর্বনাশ ঘটেছিল যেদিন, সেই মানসিক যন্ত্রণায় ক্লান্ত হয়ে যখন কলিম শরাফির ঘরে গিয়ে, কাঁধের ব্যাগটা নামিয়ে রেখে জামা কাপড় ছেড়ে শুধুমাত্র লুঙ্গিটা পরে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। সেই মুহুর্তে চোর এসে আপনার পরিধানের পোষাকটুকু ছাড়া আর সব নিয়ে চলে গেল। যন্ত্রণার ওপর যন্ত্রণা। তখনো জানা ছিল কি, যে আর এক যন্ত্রণা অপেক্ষা করে বসে আছে আপনার জন্যে? হাতিবাগানের লক্ষ্মী ব্যাঙ্কে রাখা ছিল সামান্য কটা টাকা, সেটা তুলতে গিয়ে দেখলেন সেই দিন, মনে পড়ে ঠিক সেই দিনেই ব্যাঙ্ক ফেল করেছিল? যন্ত্রণার ত্র্যহস্পর্শ।

আবার পর পর তিনদিন না খেয়ে কলকাতার রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়ানো একটা কাজের সন্ধানে। কেউ একটা কাজ দিল না। বেকবাগানের মোড়ে শরীরটাকে বাঁকিয়ে কর্পোরেশনের কলে বাঁ-হাতে ভর রেখে ডান হাতে মুখ ঠেকিয়ে যখন জল খেয়ে পেট ভরাচ্ছিলেন সেই সময় আপনার খোঁজেই হন্যে হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে আর এক শিল্পী কামরুল হাসান। ঐ মুহুর্তে আপনার পেছনেই সে দেবদূতের মত এসে দাঁড়াল। আপনাকে টেনে নিয়ে গেল রাইফেল রোডে, চার নম্বর পোলের কাছে আজাদ পত্রিকার নিউজ এডিটর মহম্মদ মুদাব্বের-এর বাড়িতে। তারা চলে গেছে পূর্ব-পাকিস্তানে। সেই খালি বাড়িতে আপনাকে বসিয়ে রেখে কামরুল নিয়ে এল জিলাপি আর পাঁউরুটি। তিন দিনের উপবাস ভাঙ্গার কি অদ্ভুত উপকরণ। এর আগেরবার আম্বরখানায় সাত দিনের উপবাস ভঙ্গ করেছিলেন লেড়ো বিস্কুট আর কালো চা দিয়ে, মনে পড়ে খালেদদা?HITLAR

আপনি বলেছিলেন যে চন্দ্রনাথ দত্ত, মানে আপনার পিতৃদেব যখন খুব পেটাতো, তখন দাঁতে দাঁত চেপে আপনি দাঁড়িয়ে থাকতেন। তাতে বাবার রাগ আরও বেড়ে যেত আরো পেটানি খেতেন। ‘যন্ত্রণা’-ও ঠিক আপনার বাবার মত। আপনার ঐ একবগ্গার মত সারাটা জীবন ধরে সহ্য করার ক্ষমতা দেখে সে আরো ক্ষেপে উঠেছিল। ভেবেছিল শেষকালটায় বুঝি আপনি হার মানবেন, তাই শেষ পাঁচ মাস পনেরটা দিন (১৫ নভেম্বর ২০১৩ থেকে ৩০ এপ্রিল ২০১৪) ‘যন্ত্রণা’ তার বিষাক্ত নখ দাঁত নিয়ে আপনাকে ক্ষত বিক্ষত করেছিল। তবু আপনি মৃত্যুকে নিয়ে ইয়ার্কি করেছেন বিছানায় শুয়ে শুয়ে। কখনো কখনো গান গেয়েছেন গুনগুন করে, ‘নাইয়া নদীর কূল পাইলাম না / ভেবে রাইধ্যারও মন বলে / নদীর কূলত বইস্যা পার হমু পার হইমু / কইর‍্যা আমার দিন তো গেল গইয়া রে’ …। আবার কী দুঃসাহস আপনার! আপনি জানতেন যে এটাই আপনার মৃত্যুশয্যা, তবু একটিবারের জন্যে ভগবানের শরনাপন্ন হলেন না।

আমায় ক্ষমা করবেন খালেদদা। আমি অনেক তাবড় তাবড় কম্যুনিস্ট নেতাকে দেখেছি মৃত্যুর দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে কালি-দুর্গার ছবিকে দু-হাত জোড় করে প্রণাম করতে, তাবিজ কবচ পড়তে। বালিশের নীচে আশীর্বাদি ফুল রাখতে। আপনার খুব পরিচিত এক বিশাল মাপের মানুষ, তাঁর প্রতি আমার সম্পূর্ণ শ্রদ্ধা রেখেই বলছি, কম্যুনিস্ট পার্টির সদস্যও ছিলেন এক সময়। তিনি নাকি যৌবনে কারুর প্রণাম গ্রহণ করতেন না। কিন্তু শুনেছিলাম পরবর্তীকালে কেউ প্রণাম করলে নিতেন এবং মাথায় হাত রেখে বলতেন, ‘ভগবান তোমার মঙ্গল করুন।’ এই জায়গা থেকে আপনাকে একবার পরীক্ষা করার ইচ্ছা হয়েছিল আমার। আমার ধৃষ্টতা আপনার ভক্তকূল মার্জনা করবেনা জেনেও আজ স্বীকার করতে সংকোচ নেই। একদিন সকালবেলায়, মেডিভিউ-এর ২০৭ নং বেডে হেলান দিয়ে বসেছিলেন আপনি। সীমা মুখোপাধ্যায় এসেছিল সেদিন। আমি প্রশ্ন করেছিলাম, ‘এখন যদি ভগবানের দেখা পান কি চাইবেন?’ আপনি মুচকি হেসেছিলেন, বলেছিলেন, ‘এখানে কোনও সম্ভাবনা নেই। ওপরে জাই, সেইহানে যদি আল্লা বা ভগবানের সাথে দেহা হয় তহন দেহা জাবে হ্যানে।’

‘এখানে কোনও সম্ভাবনা নেই’ … এই কথাটা এত দৃঢ়তার সঙ্গে বলেছিলেন যাতে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন আপনার আদর্শে আপনি অবিচল। আর পরের কথাগুলো? সে তো আপনার মজার কথা। তাই পূব বাঙলার ভাষায় ওইভাবে বললেন।

যাক, যে কথা বলছিলাম। আপনি যন্ত্রণাকে ভয় পেলেন না, ভগবানকে ডাকলেন না, তাই ‘যন্ত্রণা’ আপনাকে ২৯ এপ্রিল বেলা ১২টা, শেষ ডায়ালিসিস পর্যন্ত আপনার পিছু ছাড়েনি। কিন্তু এক সময় তাকেও হার মানতে হল আপনার অমানুষিক সহ্য ক্ষমতা আর অসম্ভব নির্লিপ্ততার কাছে। ২৯ এপ্রিল ২০১৪ আপনার ৭৯৩-তম ডায়ালিসিস হল। মনে আছে প্রথম ডায়ালিসিস কবে হয়েছিল? সেটাও একটা ২৯ তারিখ। মার্চ মাসের ২৯ তারিখ। ২৯/০৩/২০০৮। কী করে নিলেন এতগুলো ডায়ালিসিস!! অবাক হওয়াটাই তো বিস্ময়ের। আপনার পক্ষেই তো সম্ভব। না হলে অত হাজার হাজার প্রচ্ছদ করলেন কি করে? তাও আবার এই কম্পিউটারের যুগে নয়। যখন চালু হয়নি কপি-পেস্টের কাল। শুধু মাথা আর দু-খানা হাত। লেআউট, ড্রইং, উডেন ব্লক, উফ্ কি শক্ত সব ব্যাপার।

আজ থাক এই পর্যন্ত। যেখানেই থাকুন ভাল থাকুন খালেদদা। আগামী ২০ ডিসেম্বর ২০১৪ একটা প্রদর্শনী করার ইচ্ছে আছে আপনার কাজ নিয়ে, আসবেন কিন্তু। আমি জানি আপনি আসবেনই, আপনি থাকবেন প্রদর্শনীকক্ষের সবখানেই।

আমার সশ্রদ্ধ প্রণাম নেবেন।

প্রদীপ দত্ত

৩১/০৫/২০১৪

1953 JOL RONG - 1

  • প্রথম ছবি: ওড়িশার মন্দির চিত্র। দ্বিতীয় ছবি : নকশাল আন্দোলনের ছবি। তৃতীয় ছবি : হিটলার বই-এর প্রচ্ছদ। চতুর্থ ছবি : ১৯৫৩ সালে জলরঙে আঁকা ছবি।
This entry was posted in Cultural journey and tagged , , , . Bookmark the permalink.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.