আমার ছবিকথা — ৩

আমার ছবিকথা বিভাগে এবার ছবি নিয়ে কথা বলছেন বহরমপুরের শিল্পী সৌম্যেন্দ্রনাথ মণ্ডল

ছবি আঁকার প্রতি আমার ভালোবাসার শুরু একেবারে ছোট্টবেলায়, যখন আমি বাবার পাশে বসে বক আর প্রজাপতির ছবি আঁকতাম। বহরমপুরে আসার আগে আমরা থাকতাম মালদা জেলার এক অখ্যাত গ্রামে। এখানে এসে শহরের সুপরিচিত স্কুল ঈশ্বরচন্দ্র ইনস্টিটিউশনে ক্লাস সিক্সে ভর্তি হই। সে সময় কীভাবে হঠাৎ করে একবার নেহরু শিশু অঙ্কন প্রতিযোগিতায় নাম দিয়ে তৃতীয় স্থান লাভ করে ফেলি। স্বভাবতই উৎসাহ গেল বেড়ে। তারপর থেকেই মজে গেলাম ছবির নেশায়। আজ পর্যন্ত সেই নেশাতেই হাবুডুবু খাচ্ছি। ছোটবেলায় থাকতাম সরকারি আবাসনে, সেখানে একা একা বড়ো হয়ে ওঠা। তখনকার বহরমপুরের নির্জন প্রকৃতি আর বাবা-মায়ের অবাধ প্রশ্রয় — এই দুই-ই আমার অনুপ্রেরণার রাজমহল।A

ছোট থেকেই দেশিবিদেশি কত শিল্পীর আঁকা ছবি যে দেখেছি। প্রিয় শিল্পীর তালিকাটিও তাই বেশ লম্বা। তবু তারই মধ্যে লিওনার্দো দা ভিঞ্চি, ভিনসেন্ট ভ্যান গখ, কনস্টেবল আর রামকিঙ্করের কাজ আমায় পাগল করে। এঁদের আঁকা ছবিগুলি দেখি আর আনন্দে আত্মহারা হই। শিল্পকলার আকর্ষণে বেশ কিছু ভালো বই পড়েছি, যা কোনওদিনই ভুলবার নয়। প্রতিদিন রাত্রে ছবির ওপর লেখা কোনও না কোনও বই পড়ি বিক্ষিপ্তভাবে। সবচেয়ে পছন্দের বই ভ্যান গখের জীবন অবলম্বনে লেখা আর্ভিং স্টোনের উপন্যাস ‘লাস্ট ফর লাইফ’। ছবির টানে আমার বাড়িতেও জমে উঠেছে নানাজনের শিল্পকাজ। শিল্পী সঞ্জয় ঘোষের আঁকা কালিতুলির একটা ফুলদানির ড্রয়িং আছে, যা লোকশিল্পের ধারাকে আত্মস্থ করেও নিজ মাহাত্ম্যে অনন্য। মেদিনীপুরের লোকশিল্পীর আঁকা পট আছে আমার কাছে, সেটিও আমার প্রিয়। আর আছে একটি রাজস্থানী মিনিয়েচার চিত্র। তাছাড়াও আছে বেশ কিছু শিল্পীর আঁকা ছবির প্রিন্ট।B

পুরোনোদিনের শিল্পীদের কাজ দেখতে দেখতে ভাবি বাংলার শিল্পীসমাজ একদিন কত সচেতন ও সমৃদ্ধ ছিল। আজ ছবি নিয়ে সাধারণের মধ্যে যেন কোনো আকাঙ্খা নেই, ভালোবাসা নেই। হয়তো অনেক খুঁজলে গ্রাম-মফস্বলের অলিগলি থেকে দু-পাঁচজন শিল্পমনস্ক মানুষের দেখা মিলবে। সমাজে তাঁরা বড়ো একাকী। তাই মনে হয় ছবির প্রসারের জন্য ব্যাপকভাবে একটি সামাজিক আন্দোলনের দরকার। না হলে চিত্রকলার এই পবিত্র ও একদা সমৃদ্ধ প্রবাহটি একেবারে নষ্ট হয়ে যাবে। যাঁরা ছবি ভালোবাসেন তাঁদেরকে যেভাবে হোক একত্রিত করা দরকার। হতে পারে সেটা ঘরোয়া আড্ডায়, ছবির প্রদর্শনী অথবা মেলায়। উদ্ভাসের ব্লগ কিন্তু এক্ষেত্রে আমাদের পথ দেখাতে পারে। আমি অন্তত সেই আশাতেই আছি।

C

  • প্রথম ছবিটি লেখকের নিজের আঁকা, দ্বিতীয় ছবিটি রাজস্থানী মিনিয়েচার ও তৃতীয় ছবিটি লেখকের বাড়ির দেওয়ালে নিজস্ব শিল্পকর্ম।
This entry was posted in Cultural journey and tagged , . Bookmark the permalink.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.