দেবীপ্রসাদ রায়চৌধুরীর রঙবেরঙ জীবন

১৫ই জুন দেবীপ্রসাদ রায়চৌধুরীর জন্মদিন।  এই উপলক্ষ্যে ‘ছাপাখানারগলি’-র শিল্পকলা সংখ্যা (সেপ্টেম্বর ২০১১) থেকে মৃণাল নন্দী-র এই লেখাটি সংক্ষেপিত ও পরিমার্জিত আকারে আমরা প্রকাশ করলাম শিল্পী-স্মরণে।

 

‘Take back my mother’s blood’যে দৃঢ়তার সঙ্গে উচ্চারিত হয় তেমন দৃঢ়তার সঙ্গেই তুলির টান পড়ে ক্যানভাসে, গড়ে ওঠে ভাস্কর্য। ‘শিল্পকলা জীবনধারণের অবলম্বন হবে শুনে দেবীপ্রসাদের মাতুল রাজাবাহাদুর গোপাললাল রায় (তৎকালীন রংপুর অঞ্চলের তাজহাটের রাজা) ক্রোধে অগ্নিশর্মা হয়ে বলেছিলেন, ‘তুমি আমাদের বংশের কুলাঙ্গার। ছবি আঁকাকে তুমি বাঁচার সাথি করে নেবে যদি ভেবে থাক, তাহলে নিশ্চিত জেনো এ বাড়ি থেকে কোনো সাহায্য পাবে না।’ কিন্তু ১৯৫৮ খ্রিষ্টাব্দে এই কুলাঙ্গারই ভারত সরকার কর্তৃক ‘পদ্মভূষণ’ খেতাবে সম্মানিত হন। মাঝের জীবনটা স্বাভাবিকভাবেই ছিল ‘শিল্পীর সংগ্রাম’।

ছবি আঁকার ব্যাপারে পিতা উমাপ্রসাদ রায়চৌধুরীর প্রচ্ছন্ন প্রশ্রয় ছিল। ইনি ছিলেন ডায়মণ্ডহারবার অঞ্চলে মুড়াগাছা-র জমিদার। দেবীপ্রসাদের ইচ্ছানুসারে তিনিই একদিন তাঁকে নিয়ে হাজির হলেন জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়িতে শিল্পগুরু অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছে।

সুমাত্রার পাখি

সুমাত্রার পাখি

পাশ্চাত্যের Organised Principle বা Balanced Filling up of Spece নামক চিত্রশৈলীটি রপ্ত করেছিলেন অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর। এই চিত্রশৈলীটিকে ভারতীয় শৈলীর সঙ্গে মিশিয়ে পরীক্ষানিরীক্ষার দ্বারা অবনীন্দ্রনাথ প্রবর্তন করেন ‘নব্যবঙ্গীয় চিত্রশৈলী’। অবনীন্দ্রনাথের এই চিত্রশৈলী অনুসরণ শুরু করেন দেবীপ্রসাদ তার শিল্পীজীবনের প্রথম দিকে। এই পর্বের ছবির মধ্যে অভিসারিকা, জীবনসন্ধ্যা, দ্য মিস্ট, সুরের নেশা ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।

কিন্তু দেবীপ্রসাদ শুধুমাত্র নব্যবঙ্গীয় চিত্রশৈলীতে থমকে থাকেননি। তিনি এই চিত্রশৈলীর পরিমণ্ডল অতিক্রম করে নতুন পরীক্ষানিরীক্ষার দিকে এগিয়ে চলেন। তাঁর সে-সময় মনে হয়েছিল ভারতীয় শিল্পশৈলীতে Physical Reality-র অভাব রয়েছে। এই অভাব পূরণে তাঁর অবদান উল্লেখযোগ্য ছবি ‘নির্বাণ’। ছবিটির পরিবশে আলো-আঁধারের উপস্থাপনায় দেবীপ্রসাদ এগিয়ে গেছেন Physical Reality-র দিকে। ডাচশিল্পী রেমব্রাণ্টের শিল্প-অনুপ্রেরণায় অবনীন্দ্রনাথের ‘নব্যবঙ্গীয় চিত্রশৈলী’-র শিল্প-আদর্শ মিশিয়ে দেবীপ্রসাদের ‘নির্বাণ’ — ‘বুদ্ধ মন্দিরের অন্ধকারাচ্ছন্ন গর্ভগৃহে মুণ্ডিত মস্তক কয়েকজন বৌদ্ধ ভিক্ষুকের মোক্ষলাভের জন্যে ব্যাকুল প্রতীক্ষার রূপকল্পনা। স্থাপত্যস্তম্ভের ফাঁক দিয়ে এক স্বর্গীয় আলো এসে পড়েছে ভিক্ষুকের মুখে’। এই ‘স্বর্গীয় আলো’-তেই ফুটে উঠতে থাকে দেবীপ্রসাদের আত্মপরিচয়।

সন্ধ্যার জ্যোতি

সন্ধ্যার জ্যোতি

Esthatic Adventure-এর কারণে দেবীপ্রসাদের রূপকর্ম কখনও একঘেয়ে ঘ্যানঘ্যান হয়ে ওঠেনি। ‘দূরের যাত্রী’ নামক রূপকল্পনায় ফুটে ওঠে মানুষের জীবনসংগ্রামের বাঙ্ময়তা। ‘চলমান খালি গায়ে একটি মানুষের কাঁধে লাঠি, লাঠির একপ্রান্তে বাঁধা ছেঁড়া কাপড়ের পুঁটুলি। ক্লান্তিতে নুইয়ে পড়া দৃঢ়চেতা মানুষটি এগিয়ে চলেছে দিগন্তবিস্তৃত নির্জন প্রান্তরে।’ কিছুকাল পরেই ‘দূরের যাত্রী’ রূপান্তরিত হয় ভাস্কর্যে ‘He has long way to go’ নামে।

অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের যোগ্য ছাত্র ছিলেন দেবীপ্রসাদ। ভারতবর্ষে জাপানি ওয়াশ পদ্ধতির প্রথম প্রবক্তা অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর। দেবীপ্রসাদ ‘রোমান্টিসিস্ট’ ভাবধারা এই ওয়াশ পদ্ধতি অবলম্বনে অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর দ্বারাই অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন। দেবীপ্রসাদের আঁকা Calcutta Rain, After the Rain এবং After the storm-এ এই পদ্ধতির প্রয়োগ লক্ষ্য করা যায়। After the storm সম্পর্কে দেবীপ্রসাদের ছাত্র প্রদোষ দাশগুপ্ত লিখেছেন : ‘আমার মনে হয় দেবীপ্রসাদের এই ছবি তাঁর সর্বশ্রেষ্ঠ রচনা।’

দেবীপ্রসাদ কিউবিজম নিয়েও পরীক্ষা করেছিলেন। এ বিষয়ে দেবীপ্রসাদ আকৃষ্ট হয়েছিলেন গগনেন্দ্রনাথের আঁকা জ্যামিতিক কিউবিজমের ছবিগুলো দেখে। প্রতিকৃতি আঁকার ক্ষেত্রে দেবীপ্রসাদ ভ্যান ডাইক ও রেমব্রান্টের অঙ্কনরীতির দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন। জাপানি শিল্পকাজেও দেবীপ্রসাদ আকৃষ্ট হয়েছিলেন। অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন ইয়েসিন, ওকিয়ো, নাওনোবু প্রভৃতি শিল্পীদের কাজ দেখে। তবে কারো অন্ধ অনুকরণ করেননি।

১৯২২-এ সোসাইটি অফ ফাইন আর্টস কলকাতায় অনুষ্ঠিত প্রথম বার্ষিক শিল্পকলা প্রদর্শনীতে সেরা নিদর্শনের জন্য দেবীপ্রসাদ ‘প্রফুল্লনাথ ঠাকুর’ পুরস্কার লাভ করেন; এবং ১৯২২ থেকে ১৯২৫ পরপর চারবছর ফাইন আর্টস সোসাইটিতে অনুষ্ঠিত প্রদর্শনীতে সেরা শিল্পকর্মের জন্যে পুরস্কৃত হন। দেবীপ্রসাদের প্রথম একক শিল্পকলা প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয় ১৯৩৩-৩৪ সালে শম্ভুনাথ পণ্ডিত স্ট্রিটে তাঁর নিজের বাড়ির স্টুডিয়োতে।

চিত্রকলা ছাড়াও দেবীপ্রসাদের সৃজনশীলতার একটা বড়ো অংশ ভাস্কর্য। তাঁর সৃষ্টিশীল ভাস্কর্য তালিকায় রয়েছে Triumph of Labour, When winter comes, Martyrs Memorial, Modern Columns ইত্যাদি। সনাতন প্রথম অনুযায়ী ভাস্কর্য নির্মাণ হয় দুরকমভাবে, Process of addition এবং Process of elemination। প্রথমটি হল কোনো নরম উপকরণ (যেমন, মাটি) দিয়ে ভাস্কর্যটি গড়ে তোলা। আর, দ্বিতীয়টি হল শক্ত কোনো উপাদান (যেমন, পাথর) কেটে কেটে ভাস্কর্যটি গড়ে তোলা। দেবীপ্রসাদ দ্বিতীয় পদ্ধতিটির বেশি ভক্ত ছিলেন।

Martyrs Memorial

Martyrs Memorial

দেবীপ্রসাদের ভাস্কর্যগুলির মধ্যে Martyrs Memorial-টি স্থাপিত হয় পাটনায় সেক্রেটারিয়েটের সামনে। এই স্থাপত্যটির ছবি ডাকটিকিট হিসাবে প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৬৭ সালের ১লা অক্টোবর Quit India নামে।

Modern Column নামে ছাব্বিশ টন ভারি ব্রোঞ্জের স্থাপত্যটি স্থাপিত হয় ১৯৮১ সালে দিল্লীর সর্দার প্যাটেল মার্গ ও উইলিংডন ক্রিসেন্ট রোডের সংযোগস্থলে।

দেবীপ্রসাদ তাঁর পূর্বসূরিদের তুলনায় ভারতীয় ভাস্কর্য-চেতনাকে বহুদূর বিস্তৃত করে আধুনিকতার উৎসমুখে পৌঁছে দিয়েছেন। তাঁর সমকালীন সময়ে আদর্শায়িত গঠনভঙ্গি এবং আত্মপ্রকাশক শিল্পের নামে যে দুর্বল সীমাবদ্ধতা দেখা দিয়েছিল দেবীপ্রসাদের মৌলিক বলিষ্ঠ স্বকীয়তা তারই সংশোধন বলে মনে হয়।

কর্মসূত্রে দেবীপ্রসাদ মাদ্রাজের সরকারি আর্টস্কুলের অধ্যক্ষ ছিলেন। ১৯২৯-এ প্রথম একবছর সুপারিন্টেন্ডেন্ট হিসাবে ও পরে অধ্যক্ষ হিসাবে আর্টস্কুলের দায়িত্ব গ্রহণ করে তিনি শিক্ষা পদ্ধতিতে বেশকিছু অদলবদল ঘটিয়েছিলেন। দেবীপ্রসাদের আর-একটি অবদান মাদ্রাজ আর্ট স্কুলে ন্যুড স্টাডির প্রবর্তন করা। তখন সারা ভারতবর্ষে কোথাও ন্যুডস্টাডির ব্যবস্থা ছিল না, সেটা সম্ভবও ছিল না। কারণ, সে-সময় সমাজ ও মূল্যবোধ এখনকার মতো ছিল না।

চিত্রকলা, ভাস্কর্য-র পাশাপাশি ব্যঙ্গচিত্র অঙ্কনেও দেবীপ্রসাদ তাঁর স্বকীয়ধারার এবং ক্ষমতার পরিচয় রেখেছেন। তাঁর বেশিরভাগ কার্টুনচিত্র প্রকাশিত হয় স্বতন্ত্র, মজার্ণ রিভিয়ু প্রভৃতি পত্রিকায়। ১৯৭৮ সালে প্রকাশিত Cartoons of Deviprasad সংকলনে শিল্পীর চল্লিশটি কার্টুন প্রকাশিত হয়। কার্টুন সম্পর্কে দেবীপ্রসাদের বক্তব্য : ‘অনেকের ধারণা কার্টুন বা ব্যঙ্গচিত্রে বিষয়বস্তুই ছবির মুখ্য উদ্দেশ্য, প্রকাশ-কৌশল গৌণ, যেমন তেমন করে তুলি চালালেই হল। এই ধারণাটা ভিত্তিহীন — প্রমাণস্বরূপ বলতে পরি সার্কাসে যে ক্লাউন-এর খেলায় নামে সেই ওস্তাদ খেলোয়াড়। কার্টুনছবির প্রকাশভঙ্গির নিজস্ব সত্ত্বা আছে, যা হিজিবিজির নামান্তর নয়।’

এর বাইরে সাহিত্যের অঙ্গনেও দেবীপ্রসাদের বিচরণ ছিল কৈশোরকাল থেকেই। জীবনের প্রথম গল্প ‘একখানি চপ’ প্রকাশিত হয় ভারতী পত্রিকায়। জীবনভর চিত্রশিল্পকলার পাশাপাশি তাঁর কলম চলেছে সমানভাবে। ভারতবর্ষ, প্রবাসী, মৌচাক, শনিবারের চিঠি-র তিনি ছিলেন নিয়মিত লেখক। দেবীপ্রসাদের প্রকাশিত গ্রন্থগুলির মধ্যে পিশাচ, মাংসলোলুপ, পোড়োবাড়ি, বল্লভপুরের মাঠ — ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। শিকার বিষয়ক ১৪টি গল্পের একটি সংকলন-গ্রন্থ জঙ্গল প্রকাশিত হয়েছিল প্রবাসী কার্যালয় থেকে। বইটি পাঠকমহলে উচ্চপ্রশংসিতও হয়েছিল।

শ্রমের জয়

শ্রমের জয়

Advertisements
This entry was posted in Cultural journey and tagged , , . Bookmark the permalink.

1 Response to দেবীপ্রসাদ রায়চৌধুরীর রঙবেরঙ জীবন

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.