আমার ছবিকথা — ২

(অনন্তদেব মুখোপাধ্যায় মূলত চিত্রশিল্পী হলেও বর্তমানে দূরসঞ্চার নিগমের সঙ্গে যুক্ত।  থাকেন পুরুলিয়ায়।  আমার ছবিকথা বিভাগে ছবি নিয়ে ব্যক্তিগত মতামত বিনিময় করলেন মন খুলে।)

শিল্পী দুজন, একজন আঁকে আর একজন লেখে…। তার পর থাকে আর এক জন যে দেখে। আমিও দেখি…। সেই কবে প্রথম দেখেছিলাম কদমতলায় হাতি আর ঘোড়ার নাচ… … সময় চলে গেছে আর সেই স্বপ্নের ছবিগুলো ক্রমশ ফিকে হয়ে গেছে, আর তার জায়গায় চোখ খুঁজে বেরিয়েছে দবরুপান্নার রাজত্বের নদী, ঝোরা, ‌জঙ্গলে, … বিভুতিভুষনের হাত ধরে। যদিও ততদিনে আঁকার স্কুলে ভর্তি হয়েছি। গাছ, বাড়ী, আকাশের সাথে পরিচয় হয়েছে। হঠাৎ-ই এক বিপ্লবের মুখোমুখি আমি … …। চোখের সামনে মনে (Monet), রেনার, দেগা, সেজান, গঁগা, লত্রেক, পল ক্লি, এবং আর একজন ‘‘কাথে কোলভিৎজ্’’ Kathe Kollwitz(Kathe Kollwitz) বাবার আলমারি থেকে লাফিয়ে পরল আমার সামনে, আমার তো মুর্ছা যাওয়ার যোগাড়… !!! এই রকম-ই অনুভুতি ছিল যখন প্রথমবার মাহেন-জো-দারোর নারীমূর্তিটি দেখেছিলাম। অন্য এক জগৎ, আমি তার মাঝে পরে হাবুডুবু … খুব কষে কপি করতে লাগলাম ওই মহান শিল্পীদের স্কেচগুলো, আর এভাবেই আমার ছবি দেখার শুরু।

সাল টা মনে হয় ২০০১, গিয়েছিলাম অজন্তা, সে-কি ভীষণ জ্বর, সেই অবস্থায় একের পর এক গুহাতে ঢুকছি আর দেখছি … একি বিস্ময় … … তার ঘোর আজও কাটেনি।

ছবি-আঁকা ব্যাপারটা খুব জটিল, যেমন কি আঁকবো, আর কেনইবা আঁকবো, শেষে যেটা আঁকলাম সেটার ব্যাখ্যা … । ওফ কি ঝামেলা …। এভাবেই ভাবাটা যখন প্রায় রপ্ত করে ফেলেছি … বুঝলাম, বড় ভুল করেছি।

আর্ট ব্যাপারটা কি? মননের, মনের যাবতীয় প্রকাশগুলোকে গুছিয়ে, রসে চুবিয়ে মেলে ধরা। এ-তো বাইরে থেকে কিছু করা নয়। এ একেবারে ভেতরের জিনিষ। আগে মধ্যবিত্ত বাঙালি বাড়ীতে আলপনা দেওয়া, নক্সা কাটা আসন বোনা, ঝুলনে বাচ্চাদের পুতুল সাজানো ইত্যাদি ছিল খুব স্বাভাবিক, যা আজকের টিভি-মোবাইল-এর যুগে আর দেখা যায় না বললেই হয় শহুরে মধ্যবিত্ত সমাজে। ওগুলোই ছিল শিল্পের ভিত্তি।

একটা কথা প্রায়ই শুনি, অনেকেই বলে ‘‘আমি তো ছবি বুঝি না”, আর আমি বুঝি না যে ছবিতে বোঝার আছেটা কি? আধুনিক সমালোচকরা কলম দিয়ে এমন গুঁতোগুঁতি করেন যে ভালোমানুষ সাধাসিধা লোকেরা ভাবেন ওটা বুঝি বা অন্য গ্রহের কিছু। দেখতে ভালো লাগছে বা মন্দ লাগছে, এই তো, মিটে গেলো। দেখতে দেখতেই মন্দ লাগাটার কারন দর্শক নিজেই বুজে নেবে। আর ভালো লাগাটা তো নিজের নিজের ব্যাপার।monet( The Bridge at Argenteuil)1874

প্রায়-ই একটা কথা মনে হয় যে সাধারন জীবনে আর্ট এর কি দরকার? এটা এ ভাবে বললে আরও বুঝতে সুবিধে হবে যে নিত্য কর্মে আর্ট কোথায় আছে? এই ধরা যাক আমরা সকালে উঠেই ভালো কিছু দেখতে চাই এই বিশ্বাসে যে তাহলে দিনটা ভালো যাবে। এই ‘‘ভালো’’-টাই হল আর্ট। কেমন? যেমন শাড়ি তো একটা পড়লেই হয়, কিন্তু আমরা সেই শাড়িটাই পড়ি যেটা দেখতে সুন্দর। তাহলে ভাল-র সাথে সুন্দর এর একটা যোগ তৈরি করাই যায়? বলি না যে কি ভালো একটা শাড়ী পরেছে? এরজন্য আর্ট কি জানতে হয়? হয় না, কারন এগুলো স্বতঃস্ফূর্ত ভাবেই আসে অর্থাৎ কি না আর্ট আমাদের ভেতরেই আছে! জীবনের যা কিছু ভালো, সুন্দর, তার উৎস ওই আর্ট। আর্ট হল একটা চেতনা, যা জন্মের পর ধীরে ধীরে চারপাশের পরিবেশ, প্রকৃতি, আর খানিকটা জিন এই মিলে তৈরি হয়। সাঁওতাল ইত্যাদিরা তাদের মাটির বাড়ী সাজিয়ে তোলে, মা কাকিমারা আলপনা দেয়, এ সব-ই আর্টের বহমান ধারা। আমাদের কাজ সেই ধারাতে স্নাত হওয়া। তাহলে-ই আর আর্টকে বাইরে খুঁজতে হবে না, সে আপনিই এসে আমাদের ধরা দেবে।

  • প্রথম ছবিটি কাথে কোলভিৎজ্-এর আঁকা,  দ্বিতীয় ছবিটি আঁকা মনে-র।
Advertisements
This entry was posted in Cultural journey and tagged , , . Bookmark the permalink.

2 Responses to আমার ছবিকথা — ২

  1. tuhin subhra বলেছেন:

    I wish this article to be read by all the so-called modern art critics to learn how to appreciate an art piece and not to complicate the art appreciation unnecessarily to the common art lovers by using some vague, abstract expressions… special thanks to Anantadev.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.