শতবর্ষে জয়নুল আবেদিন – ১

Apeksha

Apeksha

শিল্পী জয়নুল আবেদিনের ‘অপেক্ষা’

কৃষ্ণজিৎ সেনগুপ্ত

একেবারেই জানি না এই ছবিটি শিল্পী জয়নুল আবেদিন কোন সময়ে এঁকেছিলেন।  সাদা জমিতে আঁকা কালোরঙের কালিতুলির ছবি, যে মাধ্যমে জয়নুল সিদ্ধ।  তেতাল্লিশের মন্বন্তর যাঁর তুলিতে সবচেয়ে বাঙ্ময় সেই জয়নুল আবেদিন চিরদিনই তাঁর ছবির বিষয় বেছেছেন গ্রামজীবন, আবহমান বাংলাদেশের (এপার-ওপার) সহজ সরল লোকজীবন থেকে।  মানুষ ছিল তাঁর প্রিয় বিষয়।  আর তাঁর ছবি আঁকার ঢংটি ছিল আটপৌরে।  ভীষণ পরিষ্কারভাবে দেখতে পেতেন বলেই জয়নুলের ছবিতে দুর্বোধ্যতা ছিল না এতটুকু।  যে ছবিটি নিয়ে কথা বলতে শুরু করেছি সেটি আমার অন্যতম একটি প্রিয় ছবি।  বোল্ড তুলির কাজ, বেশ দ্রুতগতিতেই এঁকেছেন বোঝা যায়।  লিনোকাট প্রিন্টের মতো দেখতে লাগে অনেকটা।  একটি মেয়ে দরজায় হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।  তার দাঁড়ানোটি বাইরের দিকে মুখ করে।  শিল্পী মেয়েটিকে দেখছেন যেন ঘরের ভেতর থেকে।  মাটির বাড়ি, মাথায় চালা, দরজায় চৌকাঠ সবকিছু সুস্পষ্ট।  মেয়েটির বয়স অনুমান হয় আঠেরো থেকে পঁচিশের মধ্যে।  হয়ত বিবাহিতাই।  যখনই ছবিটি দেখি নানারকম গল্প আসে মাথায়।  এইরকম সাদামাটা একটি মেয়ের দাঁড়িয়ে থাকা কীভাবে ছবি হয়ে উঠল।  দরজার বাইরে যতটুকু দৃশ্য দেখা যায় তাতে বেশখানিকটা আকাশ, মেঘহীন, দুপাঁচটা পাখি।  অনতিদূরে জঙ্গল।  মাটিতে কয়েকটা তুলির আঁচড়।  যেন মনে হয় শুকনো-রুক্ষ সময়, কোথাও জলকাদা নেই।  কিন্তু মেয়েটির দাঁড়িয়ে থাকা কিসের জন্য?  সদ্য ঘুম থেকে উঠে দরজা খুলে বাইরের আকাশ দেখছে সে?  ভোরের নরম আলোয় সে কি গতরাত্রের স্বপ্নটির কথা ভাবছে?  ভোরবেলার স্বপ্ন সত্যি হয় এমন একটি ধারণার প্রচলন আছে।  নাকি সারাদিনের কাজের মাঝে একটু অবসর পেয়ে মেয়েটি আকাশের দিকে তাকিয়ে ভাবছে অন্যকিছু?  গতবছর খরায় ধান হয়নি ভালো।  এবছরও আকাশে মেঘের দেখা নেই এখনও।  তার বাবা গেছে জমি চাষ করতে।  ভাগচাষি সে, পরের জমিতে লাঙল দেয়।  ফসলের ওপর সারাবছরের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য নির্ভর তাদের।  মেয়েটি কি মেঘের অপেক্ষায়?  অথবা এসব কোনোটাই নয়।  বাংলাদেশ জুড়ে মুক্তিযুদ্ধ চলছে, স্বাধীনতার লড়াই।  মেয়েটির স্বামী একজন মুক্তিযোদ্ধা।  দীর্ঘদিন সে আসে না তার বাড়িতে।  এর ওর মুখে নানারকম সংবাদ শোনা যায় তার।  কেমন আছে মানুষটা?  দেশ স্বাধীন হলে সে ফিরে আসবে নিশ্চয়ই।  কিন্তু কবে?  স্বামী আর স্বাধীনতার অনন্ত প্রতীক্ষায় কি দাঁড়িয়ে আছে মেয়েটি?  কিংবা বহুদিন পর গতরাতে চুপিসারে এসেছিল তার স্বামী।  মাত্র কয়েকঘণ্টা থেকে ভোর হতে না হতেই আবার সে চলে গেছে নিরুদ্দেশে।  তাকে বিদায় জানিয়ে ঘরের ভিতর ঢুকতে মন চাইছে না, তাই দরজায় দাঁড়িয়ে আনমনা হয়ে সে দেখছে স্বামীর বিদায়ের পথ?  অপেক্ষা — ফের কবে আসবে সে …।  শিল্পী ছবিটির নাম রেখেছেন ‘অপেক্ষা’।  তাই এইরকম গল্পের কথাই বেশি করে মনে হয়।  একটি মেয়ের জীবনের বেশির ভাগটাই তো অপেক্ষা দিয়ে সাজানো।  দিনের পর দিন পার হয়ে যায়।  ঋতু, বছর বদলায়, মেয়েদের অপেক্ষা দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হতে হতে একসময় অনন্ত হয়।  সামান্য একটা চাওয়া, একটা প্রাপ্তির প্রত্যাশা দেখতে দেখতে রূপকথা হয়ে যায়।  নিভৃত সে রূপকথা তখন লেখা হয় ঘরের মেঝেয় পাতা একলা বিছানায়, জানালার গরাদে, দরজার চৌকাঠে, প্রসারিত নির্মেঘ আকাশে, গাছের ডালপালার আন্দোলনে।  সেই না-লেখা অপেক্ষার ইতিহাস, সাধারণ কোনো এক মেয়ের নিজস্ব রূপকথা — রাজারানিবিহীন।  জয়নুল আবেদিন এই ছবিতে সেই ইতিহাস, সেই রূপকথাই যেন লিখেছেন।  ছবি দিয়ে লেখা।  মেয়েটির চারিপাশে কালোরঙের ঘেরাটোপ (ছবির ভাষায় আমরা একে ফ্রেম বলতে পারি)।  তুলির শুষ্কতায় সেই কালোরঙের মাঝে মাঝে সাদাকাগজের উঁকিঝুঁকি, নিরন্ধ্র আকাশে বিদ্যুৎচমকের মতো।  মেয়েটির ঘরোয়া বেশে আকাশের অল্প আলো লেগেছে।  আলো মাটিতেও, যে মাটিতে পা দিয়ে সে দাঁড়িয়ে।  কিন্তু দরজার সামনে দিয়ে দৃষ্টি বেশিদূর যেতে পারে না।  কালোরেখার জঙ্গলে সে বাধা পায়।  জানি না হয়ত আকাশে দৃষ্টির অবাধ প্রশ্রয় বলেই সে তাকিয়ে আছে উপরের দিকে।  স্বপ্নবোনায় যেখানে কোনো বাধা নেই।

এত সহজ সুন্দর ছবি, কিছুটা বিষণ্ণরসেরও।  যেকোনো সৌন্দর্যের মধ্যেই একটু বিষণ্ণতা লুকিয়ে থাকে।  একটা না-পাওয়ার অনুভব।  শিল্পী সেই অনুভবকে ছুঁতে পারেন।  তাঁর সেই স্পর্শেই মানুষের বিষণ্ণতা, না পাওয়া, পাওয়ার অপেক্ষা অমরতা লাভ করে।  কাগজ অথবা ক্যানভাসকে ছোঁওয়ার আগে সে তো শূন্যই থাকে।  চিত্রকর সেখানে আঙুল রাখলে সবকিছু বদলে যায়।  আশা-নিরাশা, সুখ-দুঃখ, ধ্বংস-নির্মাণ, ভালোবাসা-প্রতিবাদ সবই শিল্পী রচনা করেন শূন্যতায়।  শিল্পীর এই নিরন্তর ক্রিয়ার মধ্যেও যেন কিসের অপেক্ষা লুকিয়ে থাকে।  আমরা কখনও তাকে চিনতে পারি।  আবার কখনও সে অধরা থেকে যায়।  কখনও সে থাকে আমাদের বুঝে ওঠার অপেক্ষায়।  জীবনজুড়ে অপেক্ষার এতরকম সমাহার!  সামান্য কয়েকটা দাগ, রেখা, তুলি-পেন্সিলের টান এভাবে আমাদের আনমনা করে দেয়, ভাবিয়ে তোলে।  আমরা অন্যরকম হয়ে উঠি।  আমার ধারণা শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের আঁকা এই গ্রাম্যমেয়েটির ছবির মধ্যে আমাদের অন্যরকম হয়ে ওঠার বীজ লুকিয়ে আছে।  একটি যথার্থ সুন্দর সৃষ্টি সবসময়েই গর্ভে ভাবনার বীজকে ধারণ করে।

লেখাটি ছবি নিয়ে লেখা বইটি থেকে গৃহীত।  প্রকাশক : কবিতা পাক্ষিক, ৪৯ পটলডাঙা স্ট্রিট, কলকাতা ৭০০০০৯

লেখাটি download করতে হলে এখানে click করুন

Advertisements
This entry was posted in Cultural journey and tagged , , . Bookmark the permalink.

3 Responses to শতবর্ষে জয়নুল আবেদিন – ১

  1. tuhin subhra বলেছেন:

    boite agei porechhilam…abaro porlam…aneke poruk,januh ei asha rakhi…

  2. tuhin subhra বলেছেন:

    boite agei porechhilam…abaro porlam…aneke poruk,januk ei asha rakhi…

  3. Barnik Mandal বলেছেন:

    Ei chhabitao amar khub prio, r lekhatao.. chhabi niye lekha…

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s