কৃষ্ণজিৎ-এর কলাম ২ : শিল্প-দর্শক

আমাদের এই বাংলায় প্রচুর চিত্রশিল্পী ও ভাস্কর। বাংলার চিত্রকলার ইতিহাস দীর্ঘ একহাজার বছরেরও বেশি পুরোনো। স্বভাবতই এইবিষয়ে আলোচনা ও লেখালিখিও কম হয়নি। ছবি-ভাস্কর্য নিয়ে এইসব লেখাপত্রের ইতিহাস বিষয়ে একটু খোঁজখবর করতে গিয়ে বিস্ময়ে চোখ কপালে উঠে গেল। বাংলায় শিল্পের প্রথম বই লিখেছিলেন শ‍্যামাচরণ শ্রীমানী, তাঁর লেখা বইটির নাম ছিল আর্যজাতির শিল্পচাতুরী। সে হল উনিশ শতকের কথা। তারপর এদেশে যে কত শত বই প্রকাশিত হয়েছে তা গুণে বলা খুব শক্ত। আমার অসম্পূর্ণ হিসেবে এই সংখ্যা অন্তত দু’শো-আশি। কিন্তু বইয়ের বাইরে পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত লেখার সন্ধান যদি করি, তাহলে দেখা যাবে তার সংখ্যা দেড়হাজারেরও বেশি। ভাবা যায়! ১৯১৩ থেকে ২০০৮-এর মধ‍্যে প্রকাশিত শিল্পকলা বিষয়ক উল্লেখযোগ‍্য প্রবন্ধের সংখ্যা ১৩৬৮ । পত্রিকাগুলির মধ‍্যে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক ছবিভাস্কর্য নিয়ে লেখা ছেপেছে দেশ (৩০৫টি )। এছাড়াও প্রবাসী, বিশ্বভারতী, এক্ষণ, সুন্দরম ইত‍্যাদি পত্রিকার অবদানও কম নয়। এছাড়া রয়েছে রোদে ধান ছায়ায় পান, চিত্রকল্পকথা-র মতো লিটল ম্যাগাজিন, যাদের ভিত্তিই হল ছবিভাস্কর্য।

এখন কথা হল, এত যে প্রয়াস, এত যে প্রবন্ধ-নিবন্ধ-সাক্ষাৎকারের তুমুল আয়োজন তবুও এ পোড়া দেশে শিল্পের দর্শক নেই কেন? আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন শিল্পীদের দেশে দর্শকদের এই দুর্দশা দেখে গা জ্বলে যায়। আমরা কি নিয়ে গর্ব করবো সেটাই তো জানি না।

Advertisements
Posted in Cultural journey | Tagged , , , | এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান

কৃষ্ণজিৎ-এর কলাম ১ : কলকাতার ছবি

শহর কলকাতার প্রথম ছবি এঁকেছিলেন ব্রিটিশ চিত্রশিল্পী উইলিয়াম হজেস। তাঁরই দেখানো পথে হেঁটে পরবর্তীকালে কলকাতার দৃশ্য এঁকেছেন অসংখ্য শিল্পী। কলকাতা ছাড়া ভারতের আর কোনো শহর এতবেশি ছবিতে নন্দিত হয়নি। পৃথিবীতেও কি হয়েছে? আমার জানা নেই। তা সে যাই হোক, শিল্পীদের আঁকা কলকাতার ছবি সালতারিখ মিলিয়ে পরপর সাজিয়ে দেখলে পাওয়া যায় এক অনবদ্য দৃশ‍্য-ইতিহাস। সে ইতিহাস অবশ্য কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানো হয় না। তা না হোক, কিন্তু শহর কলকাতার দৃশ্যপট ও তার বাসিন্দার চালচলনের বিবর্তনের ধারা বুঝতে গেলে এইসব ছবিগুলি হল একবারে মোক্ষম উপাদান। আমি তাই মাঝেমাঝেই শিল্পীদের আঁকা কলকাতার ছবি বিষয়ে প্রবল উৎসাহী হয়ে পড়ি। আমার সংগ্রহে কলকাতাকে নিয়ে আঁকা কয়েকশো ছবির প্রিন্ট আছে। সেগুলো দেখতে বসে তাক লেগে যায়। এ যেন এক অলৌকিক চলচ্চিত্র!

আধুনিকযুগে কলকাতা বিষয়ক ছবির শ্রেষ্ঠশিল্পী হলেন সমীর বিশ্বাস। তিনি যে কত হাজার কলকাতার স্কেচ করেছেন তার হিসেব পাওয়া শক্ত। জলরঙেও তিনি কলকাতার দৃশ্য এঁকেছেন অনেক। তাঁর ছবিতে কলকাতার ঘরবাড়ি ও পথঘাটের সঙ্গে থাকত কর্মরত মানুষের সমাগম। সমীর বিশ্বাস ছবি আঁকতেন খুব সাবলীল রেখায়। তাঁর তুলি ও পেনসিলে ছিল স্বতঃস্ফূর্ত গতি। তাই কলকাতার প্রাণবন্ত রূপ অসামান্যভাবে ধরা পড়ত তাঁর চিত্রপটে। কলকাতার বিখ্যাত স্থাপত্য আঁকার জন‍্য রথীন মিত্রেরও তুমুল খ‍্যাতি আছে। কিন্তু আমি তাঁর ছবিতে কোনো প্রাণ পাই না। যদিও খুবই যত্ন নিয়ে ও একাগ্রচিত্তে আঁকতেন তিনি। কিন্তু তাঁর ছবির রেখার আড়ষ্টতার জন্য, ভুল পরিপ্রেক্ষিতজ্ঞানের জন্য কিরকম একটা ‘ইয়ে’ লাগে। সমীর বিশ্বাসের ছবিতে এই ‘ইয়ে’-র দোষ একেবারেই নেই। ইংরেজ চিত্রশিল্পীদের ছবির রঙের জেল্লা ও আড়ম্বর তিনি আনতে না পারলেও কলকাতার আধুনিক রূপ-কে তিনি যথার্থভাবে কাগজবন্দি করেছেন। তাঁর ছবি দেখলে এইসময়ের মানুষের কর্মব‍্যস্ততা, তার অবসরযাপন যেমন বোঝা যায়, ঠিক তেমনই বোঝা যায় ‘পাতালরেলের খাল/ ভাঙাচোরা দিনকাল/পদেপদে ঠোক্কর/বকর-বকর’-এর দিনলিপি। আজ থেকে কয়েক শতাব্দী পরে মানুষ যখন কলকাতাকে দেখতে চাইবে তখন সমীর বিশ্বাসের আত্মবিশ্বাসী ছবিগুলি দলিলের মর্যাদায় অভিষিক্ত হবে এ বিষয়ে আমি সুনিশ্চিত। কলেজ স্ট্রিটের বইপাড়া, শিয়ালদা স্টেশন, নিউমার্কেট, গড়িয়াহাট, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়, বাবুঘাটের মতো কলকাতার প্রতীকতুল‍্য জায়গাগুলি তাঁর ছবিতে যে বিশ্বস্ত অনুপুঙ্খতায় ও চরিত্রে ফুটে উঠেছে তার কোনো তুলনা নেই। আমার তো খুবই ইচ্ছে করে সবাইকে ডেকে ডেকে তাঁর ছবিগুলি দেখাই। কলকাতায় তো কত মানুষেরই বাস, কত লোকেরই আনাগোনা, কিন্তু শিল্পীর মতো করে এই শহরকে ভালোবাসতে পারেন ক’জন?

প্রয়াত শিল্পী সমীর বিশ্বাস-এর স্ত্রী এখনও তাঁর আঁকা কলকাতা-সিরিজের ছবিগুলির প্রিন্ট অত‍্যন্ত যত্ন নিয়ে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ ও সরবরাহ করে চলেছেন অল্পদামে, বাস্তবিকই এ এক বিরল নজির।

Posted in Cultural journey | Tagged , , , , , | এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান

কার্টুনিস্টের চোখে দেখা কিনতে হলে …

উদ্ভাসের সদ‍্য প্রকাশিত বই অনলাইনে কিনতে হলে নিচের লিঙ্ক ব‍্যবহার করতে পারেন :

https://www.boichoi.com/index.php?route=product/product&product_id=17890

Posted in Cultural journey | Tagged , , , | এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান

অাগুন-তুলি

Posted in Cultural journey | Tagged , , , | এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান

প্রথা ভাঙার শিক্ষক — হেমেন্দ্রনাথ মজুমদার

হেমেন মজুমদার। শিক্ষক না হতে চাওয়া এক শিক্ষকচিত্রশিল্পীকে নিয়ে গল্প বলতে শুরু করলেন দেবকুমার সোম

‘‘সর্বাপেক্ষা মিথ্যা ও হাস্যকর ব্যাপার — এই ‘ভারতীয় পদ্ধতি’ শব্দটি। যিনি সর্বপ্রথম এই শব্দটি উচ্চারণ করিয়াছিলেন, তাঁহার মধ্যে সৎবুদ্ধির একান্ত অভাব ছিল। আরো আশ্চর্যের বিষয় এমন অসার কথা দেশের গাত্রে বিলক্ষণ দাগ কাটিয়াছে।’’ ভারতীয় কলা নিবন্ধে হেমেন্দ্রনাথ মজুমদার স্পষ্টত দুটো বক্তব্য রাখলেন। এক আর্নেস্ট বিনফিল্ড হ্যাভেল এবং অবনীন্দ্রনাথের নব্যভারতীয় শিল্পকলা, যা গর্ভমেন্ট আর্ট স্কুলে শেখানো হতো, তা ছিল ‘অসার’। আর দ্বিতীয় যে কথাটা তিনি স্বীকার করেছেন, তা হল এই, নব্যভারতীয় শিল্পকলার যথেষ্ট প্রভাব ছিল সমকালীন সময়ে। বস্তুত ১৮৯৬ সালের ৬ জুলাই হ্যাভেল কলকাতার গর্ভমেন্ট আর্ট স্কুলের দায়িত্ব গ্রহণ করেই এদেশের শিল্পশিক্ষার অভিমুখ পাল্টে দেন। অবনীন্দ্রনাথকে দোসর করে তিনি তখনকার স্বদেশিকতার সঙ্গে সাযুজ্য রেখেই তাঁর চিত্রশিক্ষার মডেল তৈরি করেছিলেন। কিন্তু সেদিনের ইউরোপীয় প্রকরণকে সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে প্রাচীন ভারতীয় শিল্পকলার চর্চা আর্ট স্কুলেরই কিছু ছাত্র মেনে নিতে পারেননি। তাঁদের মনে হয়েছিল, শিল্পকলার যে ব্যপ্তি ঘটেছে পশ্চিম ইউরোপে, তার অভিঘাত ভিন্ন এ দেশে চিত্রচর্চা মানেহীন। ফলে ১৮৯৭ সালেই রণদাপ্রসাদ গুপ্তের নেতৃত্বে পাল্টা এক শিল্পচর্চার স্কুল তৈরি হয়। যার নাম ‘জুবিলি আর্ট অ্যাকাডেমি’।

স্কুলের ফাইনাল পরীক্ষায় না বসে হেমেন্দ্রনাথ ময়মনসিংহের গাছিহাটা গ্রাম থেকে পালিয়ে আসেন কলকাতায় তাঁর এক দিদি হৈমলতার কাছে। কারণ, হেমেন্দ্রনাথের চিত্র সাধনাকে অনুমোদন করেননি তাঁর পিতৃদেব দুর্গানাথ মজুমদার এবং তাঁর অগ্রজরা। বালক বয়স থেকেই হেমেন্দ্রনাথ ছিলেন কিছুটা উগ্র। নিজের মত ও স্বাধীনতা অনুসারে আজীবন চলেছেন। কোথাও কখনও নত হননি। হেমেন্দ্রনাথ কলকাতায় পালিয়ে এসে উঠেছিলেন দিদি হৈমলতার অখিল মিস্ত্রি লেনের বাড়িতে। তাঁর জামাইবাবু রমেশ সোমের ছিল হোসিয়ারি ব্যবসা। তবুও বালক হেমেন্দ্রনাথের মধ্যে শিল্পী হওয়ার উদগ্র বাসনা লক্ষ্য করে তিনি তাঁকে ভর্তি করে দিয়েছিলেন অবনীন্দ্রনাথের গর্ভমেন্ট আর্ট স্কুলে। গ্রামে থাকতে তাঁদের বাড়িতে আসত মাসিক পত্রপত্রিকা। সে সব ছাপা ছবি দেখেই তিনি শিল্পী হওয়ার অনুপ্রেরণা পেয়েছিলেন। মনে মনে শিল্পীর জীবন সম্পর্কে অলৌকিক ভাবনা ছিল তাঁর। আর্ট স্কুলে ভর্তি হয়েই তিনি তাঁর স্বর্গ থেকে বিচ্যুত হলেন। শিল্পকে একটা চৌখুপ্পি ঘেরাটোপের মধ্যে রেখে যেভাবে ভারতীয় শিল্পকলা সেখানে শেখানো হত, তা হেমেন্দ্রনাথের কাছে যথেষ্ট হতাশারই ছিল। হয়ত সেখানেই তাঁর চিত্রী জীবনের সমাপ্তি ঘটত। যদি না বন্ধু অতুল বসুর পরামর্শে তিনি জুবিলি আর্ট কলেজে ভর্তি হতেন। সে সময় নব্যভারতীয় শিল্পকলার বিরুদ্ধে যারা প্রথা বিরোধী, তাঁদের মধ্যে হেমেন্দ্রনাথ মজুমদার আর অতুল বসুই সবচাইতে শক্তিশালী ও মেধাবী চিত্রকর। বস্তুত এঁদের প্রভাবেই ১৯৪০ দশকে শান্তিনিকেতনের বহু বাধাবিপত্তি সত্ত্বেও রামকিংকর বেইজ ভারতীয় চিত্রকলায় পৌরুষের অলৌকিক উজ্জীবন আনলেন। নন্দলাল বসুর কাছে ছবি আঁকা শেখা বিফল হলেও চিত্তপ্রসাদ ভট্টাচার্য বহু মানুষের কণ্ঠকে ধারণ করলেন তাঁর চিত্র রচনায়। আমরা আরও দেখলাম নীরদ মজুমদার, পরিতোষ সেন কিংবা গোবর্ধন আশের মতো চিত্রকরেরা পরবর্তী সময়ে কালাপানির প্রায়শ্চিত্তকে উপেক্ষা করেই ভারতীয় চিত্রশিল্পে নিয়ে এলেন পশ্চিম ইউরোপের টাটকা বাতাস।

কিন্তু যাকে আমরা প্রথা ভাঙার শিক্ষক বলছি, কেমন ছিল তাঁর নিজের জীবনের অভিযান? জুবিলি আর্ট কলেজে তখন অবশ্যই শেখান হত তেলরঙের কাজ। ন্যুড স্টাডি তখন অকল্পনীয় হলেও ন্যাচারালিস্ট পদ্ধতিতে সেখানে ছবি আঁকা শেখান হত। গভর্মেন্ট আর্ট স্কুলের চাইতে জুবিলিতে চিন্তাচেতনার স্বাধীনতা খানিকটা বেশিই ছিল। ফলে প্রথাগত শিক্ষা শেষে বিডন স্ট্রিটে শুরু হল ইন্ডিয়ান অ্যাকাডেমি অফ আর্ট। সঙ্গী হলেন অতুল বসু ও যামিনী রায়। তাঁদের এই সংগঠনের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল কম দামে ভালো মানের আর্টের প্রচার। ছবি যদি কেবল রাজরাজার প্রাসাদের দেওয়ালে বন্দী থাকে, তবে সাধারণজন কীভাবে ছবির প্রতি উৎসাহিত হবেন? ফলে পত্রিকা ছাপানোর ব্যবস্থা হল। তখন ভালো মানের ছবি ছাপার মতো ভালো মুদ্রণ ব্যবস্থা ছিল না। উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী হাফটোনের ছবি ছাপানোর কারিগরি শিখে তাঁর প্রেসে এই পত্রিকা ছাপানোর ব্যবস্থা করলেন। আর এই পত্রিকা ও অ্যাকাডেমির অন্যান্য কাজের মধ্যে দিয়ে অবনীন্দ্রনাথনন্দলালের বিপ্রতীপে নিজেদের প্রতিস্থাপিত করতে পারলেন হেমেন্দ্রনাথ এবং তাঁর সহযোদ্ধারা। এই অ্যাকাডেমির মাধ্যমে হেমেন্দ্রনাথের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছিল দেশ জুড়ে। বিশেষত বোম্বাই (এখনকার মুম্বাই) শহরে তাঁর চিত্র খ্যাতি ম্লান করে দিয়েছিল পশ্চিম ভারতের শ্রেষ্ঠ শিল্পীদের। এ অ্যাকাডেমির অন্যতম প্রধান কাজ ইন্ডিয়ান মাস্টার্স সিরিজ। তখনকার কলকাতায় বসে পশ্চিম ইউরোপের মতো তিনিও ভারতীয় চিত্রকরদের ছবির বই প্রকাশ করতে থাকলেন। যা বহু বিশ্রুত ছবিকে জনপ্রিয়তা দিয়েছিল সে সময়। এই অ্যাকাডেমি থেকেই পরবর্তী সময়ে শিল্পী নামে একটা বাংলা মাসিক পত্রিকা প্রকাশ করতে থাকেন। এখানে গ্রহণযোগ্য বিষয় এই যে, হেমেন্দ্রনাথ চিত্রশিল্পের শিক্ষক হতে চাননি। যা ছিল সেকালের দস্তুর। তিনি আজীবন একজন শিল্পী ও শিল্পের প্রচারক হিসেবেই নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছিলেন। ১৯৩১ থেকে ১৯৩৮ সাল অবধি হেমেন্দ্রনাথ ছিলেন রাজদরবারের শিল্পী। প্রথমে কাশ্মীরের রাজার আহ্বানে শ্রীনগরে একবছর কাটান। তারপর পাতিয়ালার রাজদরবারে। এরপর ১৯৩৮ সাল অবধি পাতিয়ালা, বিকানীর, যোধপুর, ঢোলকপুরের রাজচিত্রকর হিসেবে কাটিয়ে ফিরে আসেন কলকাতায়। এই সময়টায় এবং পরবর্তীকালে ১৯৪১ থেকে ১৯৪৩ ময়ূরভঞ্জের রাজদরবারে ছবি আঁকা ছাড়া বাকি জীবন তিনি কলকাতায় এবং শেষ জীবনে নিজের গাঁ গাছিহাটাতেই শিল্পচর্চা করেছেন। অর্থাৎ আমাদের বলার কথা এই যে, শৈশব থেকে তাঁর মধ্যে যে প্রথাবিরোধীতা ছিল, তা নিয়েই নাগরিক কিংবা গ্রাম্য জীবনের ছবি এঁকেছেন তিনি। স্তম্ভিত করেছেন তাঁর সময়কে।

তিনি ছবি আঁকার কার্য প্রকারণে আলোড়ন তুলেছিলেন শাস্ত্রবিরোধিতায়। জলরঙ নয়, তাঁর ছবি আঁকার মাধ্যম ছিল তেলরঙ। পশ্চিম ইউরোপের ইমপ্রেসনিস্ট শিল্পীদের মতো বড়ো ক্যানভাসে তিনি তেলরঙের পৌরুষ দেখিয়েছেন। নিসর্গচিত্র নয়। তাঁর বিষয় ছিল মানুষ। মানুষের মুড। মানুষের ভঙ্গিমার কাব্যময়তা। হেমেন্দ্রনাথের কাজের এই পরিধি কলকাতায় সে সময় বলার মতো একটা ঘটনা ছিল। কারণ তাঁর ছবিতে কোথায় জলরঙ? কোথায় নিসর্গ চিত্র? কিংবা ধর্মীয় শিল্পবোধ?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর সমসাময়িক ছবির জগতে তাঁকে এক বৈপ্লবিক সংঘর্ষের মধ্যে দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল। বস্তুত তখনকার দিনে মডেলহীন, উপকরণহীন চিত্রচর্চার কালে দেবদেবীর ছবি আর পাহাড়, নদীর ছবি ছাড়া মানুষ আঁকবেনই বা কী? আর যদি পোর্ট্রেট আঁকতেই হয়, তবে দেশনেতার ছবি কিংবা পরিবারের লোকজনদের ছবি আঁকাই তো ভারতীয়তা? এই ছিল সেদিনের স্বাভাবিক প্রবণতা। আর তার কারণও ছিল বিস্তর।

আমাদের চিত্রশিল্প, সাহিত্যে তখন লেগেছে ইংরাজি ধরণ। ভিকতোরিয়ান মূল্যবোধ। বঙ্গিমী সাহিত্যে বায়রন, শেলিদের উক্তি বিষবৃক্ষ উপন্যাসে বঙ্কিম শেষ বাক্যে এসে ভিকতোরিয়ান মূল্যবোধের শিকার হলেন। রবীন্দ্রনাথের চোখের বালি আর শরৎচন্দ্রের চরিত্রহীন গুস্তভ ফ্লবেয়রের মাদাম বেভারী কিংবা ভলতেয়রের ক্যান্ডিট হতে ব্যর্থ হল। আর চিত্রকলায় ১৯০৫ সালে অবনীন্দ্রনাথের হাতে সৃষ্ট হল ভারতমাতা বঙ্কিমের বন্দেমাতরমএর মতোই অবনীন্দ্রনাথের ভারতমাতা দেশোদ্ধারে নিবেদিত মানুষের কাছে আত্মচেতনার প্রতীক হয়ে উঠল। ইংল্যান্ডের ভিকতোরিয়ান মূল্যবোধে আঁকা ছবিগুলোর মতো এদেশের শিল্পীরা নারী শরীরের ছবি আঁকলেন। প্রোফাইলে নয়, যেখানে শরীরের বিপদজনক ভাঁজগুলো চিহ্নিত হয়। সামনাসামনি, যেন দ্বিমাত্রিক। আর নারী শরীরের মুখ ছাড়া বাকি সবটাই পোশাক আবরিত। অর্থাৎ কামপ্রেমহীন ক্যালেন্ডারের দেবী ছবির মতোই অনুভূতিশূন্য করে আঁকা হতে থাকল নব্যভারতীয় শিল্পবোদের নারী শরীর

অথচ আমাদের দেশের মেয়েরা তখনও ইউরোপীয় মেয়েদের মতো ব্লাউজ, সেমিজ, পেটিকোট পড়তে শেখেনি। তারা জানে না অন্তর্বাসের মাহাত্ম্য। আমাদের গ্রামদেশের মেয়েরা তখন অন্তঃপুরবাসিনী। তারা যদি কোন বিশেষ কারণে ঘরের বাইরে যায়, তাদের বাহন হয় পালকি। নতুবা ছই ঢাকা গরুর গাড়ি। তখনকার বাংলার গাঁদেশে, এমনকি শহর কলকাতায় প্রায় অক্ষরহীন মেয়েরা পথের ধারে বনফুলের মতো বেড়ে উঠেছিল। এদের কথা শরৎচন্দ্র রাখঢাক করে যেটুকু আমাদের জানিয়েছেন, তাই আমাদের সাহিত্যের ইতিহাসে এক বৈপ্লবিক চেষ্টা। তাঁর মতো এত গভীর আর গোপনভাবে কেই বা আমাদের মেয়েদের কথা লিখেছেন?

হেমেন্দ্রনাথ মজুমদার ঠিক তেমন করেই তাঁর ছবিতে মেয়েদের, গ্রাম্যবালাদের অমর রেখে গেছেন। আমাদের মেয়েদের যৌনতাবোধ (সেক্সুয়ালিটি) তাঁর ছবিতে যেভাবে উঠে এসেছে, তেমনভাবে তখনকারকালে অচিন্তনীয়ই ছিল। তাঁর পল্লিপ্রাণ, স্নানান্তে, সিক্তবসনা, সজ্জা সমাপন, পরিত্যক্তা, তন্ময়, সদ্যস্নাতা, বর্ষা এবং আরও বহু বহু ছবিতে রয়ে গেছে প্রাণোদিত এই যৌনতাবোধ। যা দর্শনে অশ্লীলতা নয়, বুকে জন্ম নেয় প্রগাঢ় প্রেম। মায়া। আমাদের ঘরের মেয়ে, যে নাবালিকা বয়সে বাপের ঘর ছেড়ে শ্বশুর ঘরে এসেছে। যৌবন শুরুর আগেই যে একাধিক সন্তানের মা। ভোর থেকে মাঝরাত সংসারের সব কাজ, অকাজের দায়িত্ব সামলানোর ফাঁকে যার মনে ফাঁকি পড়ে গেছে। সেই মেয়ে যখন পুকুরে সদ্য স্নান সেরে এক খণ্ড ভিজে কাপড়ে কাঁখে কলসি নিয়ে খিড়কির দোর দিয়ে বাড়ি ফিরছে তখন আকাশে উল্লাসিত রোদ্দুর, বাতাসে উচ্ছ্বসিত ফুলের গন্ধ। বড়ো স্নিগ্ধ। বড়ো সজল। বড়ো মায়ামায় সেই যৌনতাবোধ। নব্যভারতীয় শিল্পচর্চার প্যারাডক্স হিসেবেই তখন প্রতিভাত হয়েছে হেমেন্দ্রনাথ মজুমদারের সৃষ্টি। অথচ, স্নান ও নারী এ দুটো বিষয়কে এক করে ছবি আঁকা হেমেন্দ্রনাথ প্রথম চালু করেছিলেন তা নয়। ইউরোপে নারীর এই গোপন ও ব্যক্তিগত প্রাত্যহিকী বহুকাল ধরে চিত্রের বিষয়। আমাদের দেশে রাজা রবি বর্মা কিংবা বামাপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায়ও সদ্য স্নানার ছবি এঁকেছেন। তবে বিষয় হিসেবে তাঁরা কেউই এমন সত্যনিষ্ঠ অলৌকিক শিল্প সৃষ্টি করতে পারেননি। বোধহয় হেমেন্দ্রনাথ মজুমদারই প্রথম শিল্পী, যিনি ভারতীয় মেয়েদের একান্ত বস্তুনিষ্ঠ ছবি এঁকেছিলেন। ফলে তাঁর ছবিতে এসেছে নাটকীয়তা। এসেছে নারীর একাকীত্ব। ঘরের বাইরে, কিংবা ঘরের ভেতরে তাঁর ক্যানভাস যখনই কোন নারীর সন্ধান করেছে, তখনই দেখা গেছে সেই নারী বিবাহিতা, সংসারি হওয়া সত্ত্বেও একা। তার একাকীত্বই হয়েছে হেমেন্দ্রনাথের ছবির মূল সুর।

প্রথা ও শাস্ত্র বিরোধী হেমেন্দ্রনাথ অবশ্যই ব্রাত্য ছিলেন নব্যভারতীয় চিত্রকালের ভুবনে। তাতে কোন ক্ষতি বৃদ্ধি হয়নি বলেই আমার বিশ্বাস। কারণ, হেমেন্দ্রনাথ মজুমদার নিজের বিশ্বাসে ছিলেন স্থির। উদ্ভাবনী শক্তিতে ছিলেন দৃঢ়। ছিলেন এক বগ্গা। তাঁর মননে ভারতমাতা (আদিতে যার নাম ছিল বঙ্গমাতা ) হল গাঁদেশের একান্ত আটপৌড়ে মেয়েরা। যারা একাকিনী। যাদের বুক ফাটলেও মুখ কোনদিনও ফোটে না।

Posted in Cultural journey | Tagged , , , | এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান