কৃষ্ণজিৎ-এর কলাম ৬ : সংগীত-চিত্র

আমার নিজের বিশ্বাস মতে এদেশের চিত্রশিল্পীরা সংগীতকে ভালোবেসে যত সৃষ্টি করেছেন, তার তুলনায় সংগীতশিল্পীরা চিত্রকলাকে অবলম্বন করে প্রায় কিছুই করেননি। কণ্ঠ ও যন্ত্রসংগীতে চিত্রকলা ব্রাত্য হয়েই থেকে গেছে। অথচ ইওরোপে সংগীত ও ছবির কী অনর্গল ভাব বিনিময়। সেখানে চিত্রশিল্প ও সংগীতশিল্প উভয়েই একে অপরের কাছ থেকে উপাদান ও প্রেরণা গ্রহণ করে চলেছে অবিরাম। উনিশ শতকের বিখ্যাত সুরস্রষ্টা ফ্রানৎজ্ লিজ্টের II Pen Serso ও Sposalizio মিকেলাঞ্জেলো ও রাফায়েলের ছবির অনুপ্রেরণায় সৃষ্টি। আর এক বরণীয় সুরকার ডেবুসিও বত্তিচল্লির ‘প্রিমেভেরা’ প্রেরণায় সুর সৃষ্টি করেছিলেন। তাছাড়াও ভ‍্যান গঘ, পিকাসোর ছবি থেকেও সুর সৃষ্টি হয়েছে, সৃষ্টি হয়েছে ইমপ্রেসনিস্ট শিল্পীদের ছবি থেকেও। কিন্তু আমাদের দেশে এই বিষয়ে রবীন্দ্রনাথ ছাড়া আর সকলেই ছবির বিষয়ে অসম্ভব রকমের উদাসীন। আর এযুগে কবীর সুমনের গানে মাঝেমাঝে শোনা যায় গণেশ পাইন কিংবা অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রসঙ্গ। অথচ এর বিপরীতে সেই কোন প্রাচীনকাল থেকে রাগমালা ছবি এঁকে-এঁকে শিল্পীরা হয়রান হয়ে গেছেন, তবুও সংগীতশিল্পীদের এতটুকু ভালোবাসা পাননি। জানি এ বড়ো বিতর্কের বিষয়। তবুও ব‍্যাপারটা আলোচনাযোগ‍্য ও জরুরি বলে মনে হয়।

শতবর্ষ অতিক্রান্ত চিত্রশিল্পী দেবব্রত মুখোপাধ্যায় আমার বড়ো প্রিয় ও শ্রদ্ধেয়। তিনি নিজে গান করতে না পারলেও সংগীতকে ভালোবাসতেন। তাঁর সেই অনুরাগের অজস্র নমুনাও ছড়িয়ে আছে এখানে ওখানে। বেশ কিছুদিন ধরেই আমি তাঁর সংগীতপ্রেমের চিত্রিত নিদর্শন সংগ্রহ করে চলেছি। আমাদের সমাজে ছবি তো সেভাবে কেউ গুছিয়ে রাখে না, ফলে পুরোনো ছবি খোঁজার কাজটা প্রায়সময়েই খুব শক্ত হয়ে ওঠে। গত শতাব্দীর পাঁচের দশকে স্বামী প্রজ্ঞানানন্দর অসামান্য গ্রন্থ সঙ্গীত ও সংস্কৃতি-র জন্য দেবব্রত মুখোপাধ্যায় এক অবিশ্বাস্য কীর্তি করেছিলেন। তিনি ভারত ও বৃহত্তর ভারতীয় উপমহাদেশের যেখানে যত প্রাচীন দেওয়াল চিত্র আছে সেখান থেকে খুঁজে-খুঁজে বাদ‍্যযন্ত্র ও যন্ত্রীদের ছবি এঁকেছিলেন। শুধু তাই নয়, ক্ষেত্রবিশেষে তিনি বাদ‍্যযন্ত্রগুলিকেও আলাদা করে স্কেচ করে রেখেছিলেন। এমনকি একই যন্ত্র অন‍্য অঞ্চলে কেমন ভিন্ন চেহারায় প্রচলিত সে-ছবিও তিনি এঁকে রেখেছিলেন। তাঁর আঁকা এইরকম অগুণতি স্কেচের মধ‍্যে শতাধিক ছবি সংগীত ও সংস্কৃতি  বইতে ছাপা হয়। দেবব্রতর আক্ষেপ ছিল যে তিনি এইরকম একটি মৌলিক ও পরিশ্রমসাধ্য কাজের প্রাপ‍্য মর্যাদা পাননি (আর অর্থ যে কত পেয়েছিলেন সে-কথা উল্লেখ না করাই ভালো)। স্বামী প্রজ্ঞানানন্দের আরো একটি বই রাগ ও রূপ-এর জন‍্যও দেবব্রত প্রাচীন রাগমালা চিত্রের অনুসরণে অনেকগুলি রেখাচিত্র এঁকেছিলেন, যেগুলিতে তাঁর রেখাশৈলী সেইসব পুরোনো ছবিগুলিকে নতুন আঙ্গিকে উদ্ভাসিত করেছিল।

সংগীত নিয়ে একজন বরণীয় চিত্রশিল্পীর এমন প্রগাঢ় প্রেম কেমন উপেক্ষিতই রয়ে গেল। কেউ এসবের খোঁজও করে না। আর সংগীতশিল্পীদের তো কথাই নেই। বিশেষত শাস্ত্রীয়-সংগীতশিল্পীরা। তাঁরা আমাদের উচ্চাঙ্গ সংগীতকে এতটাই উঁচুতে তুলে নিয়ে গেছেন যে সেখান থেকে সমকালীন অন‍্যান‍্য শিল্পধারার কোনো সম্পর্কই আর খুঁজে পাওয়া যায় না। তাঁদের সৌজন্যে সংগীত এখন এই পৃথিবীতে এককমাত্রায় অধিষ্ঠিত হয়ে আশ্চর্য সুখে দিন কাটায়। আমরা যাকে বলি কূপমণ্ডুকের সুখ।

Advertisements
Posted in Cultural journey | Tagged , , , | এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান

বাংলার সুর সুরেলা বাঙালি

ছবির প্রদর্শনী দেখে সেই দেখার অভিজ্ঞতা অন্যের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার মধ্যেও এক ধরণের আনন্দ থাকে।  ছবি নিয়ে আলোচনার ক্ষেত্রও উন্মুক্ত হয়।  সম্প্রতি হয়ে যাওয়া বাংলার সুর সুরেলা বাঙালি শিরোনামে একটি প্রদর্শনী হয়ে গেলে নিউটাউন, কলকাতার রবীন্দ্রতীর্থ প্রদর্শশালায়।  সেই প্রদর্শনী দেখার অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিচ্ছেন দুজন : সৌরভ সেনতুহিনশুভ্র

বাংলার সুরের ছবি ও এক আশ্চর্য আয়োজন!

  সৌরভ সেন

সম্প্রতি ২১ – ২৩ জুন ২০১৯ কলকাতার নিউটাউন রবীন্দ্রতীর্থে আমার স্কুলের বন্ধু কৃষ্ণজিৎ সেনগুপ্ত-এর আঁকা ছবির একক প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হল। সঙ্গে ছিল সংগীত বিষয়ক চারটি বই এবং একটি সিডি প্রকাশ (প্রকাশক সূত্রধর, তারাই এই প্রদর্শনীর আয়োজক) আর তার সঙ্গে ছবি ও গান নিয়ে আলোচনা। আমাদের দেশে ছবির প্রদর্শনী অনেক হয়, কিন্তু এই প্রদর্শনীর বিশেষত্ব ছিল এটাই। আড্ডা, আলোচনার মেজাজে মানুষকে শেখানো, দেখানো – ছবি ও গানের সম্পর্কের নিবিড় সংযোগ কোথায় কতটুকু ও কিভাবে।

দিন কুড়ি আগে জেনেছিলাম হোয়াটসঅ্যাপ মেসেজে। যাবো তখনই নিশ্চিত ছিলাম। আসলে কৃষ্ণজিৎ-কে নিয়ে আমার আবেগ সেই কৈশোর থেকেই কিছুটা বেশি। এর প্রধান কারণ ওর অনুসন্ধিৎসু মন, অসম্ভব জেদ আর সহজে খুশি না হওয়ার প্রবণতা। যে বিষয় ও একবার ভাবে করবে, সেটা যতই বাধা বিপত্তি আসুক না কেন, সে কাজটা করেই ছাড়ে। আর, কি না বিষয় আছে ওর ভাবনার। এই ভাবনা দিয়েই ও নিজেকে উজ্জীবিত রাখে নানা আশাহীনতার মধ্যেই, অন্যনকেও উদ্বুদ্ধ করে। স্থাপত্যদরীতি, সংগীত, চিত্রকলা থেকে রেকর্ডিং, ছাপার কাজ, ফেব্রিক, সাহিত্যি সবেতেই তার অগাধ অনুসন্ধিৎসা। সে শুধু শেখে না, শিখতে শিখতে শেখায়। ও সেই চিত্রকরের জীবনী লেখে, যিনি কাঁধে ঝোলানো ব্যা গে বোমা আর তুলি নিয়ে বাংলাদেশে গিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে বসে মুক্তিযুদ্ধের ছবি এঁকেছেন। ও রেকর্ড সংগ্রহ করে আর স্বদেশী গানের রেকর্ড শুনিয়ে তাঁর ইতিহাসের বর্ণনা শোনায় মানুষকে। এহেন কৃষ্ণজিৎ যে গানের সুরকে ছবিতে ধরতে চাইবে তা-তে আর বিস্ময়ের কী আছে? শুধু দেখার ছিল প্রেজেন্টেশনটা কেমন হয়। আরো একটি বিষয়, আমরাই তো একদিন স্বপ্ন দেখতাম সকল সুকুমার কলার সমন্বয়ের আর তাকে মানব সভ্যইতায় প্রয়োগের। কালক্রমে তার থেকে আজ আমি অনেকটা সরে এসেছি বটে, কিন্তু কৃষ্ণজিৎ সরেনি – তাই ওর সেই সার্থকতাটি দেখার বড়ো লোভ ছিল আমার।

২১ তারিখ অফিস থেকে বিকাল সওয়া চারটেতে বেরোলাম। নিশ্চিন্তে নিউটাউন রবীন্দ্রতীর্থে যাবো ভেবে ট্যা ক্সি খুঁজছি সল্টলেক করুনাময়ী থেকে। যাঃ বাবা! কোনো ড্রাইভারই রবীন্দ্রতীর্থ চেনে না। শেষে এক আমারই বয়সই আমারই মতো এক গল্পবাগীশ ট্যা ক্সিওয়ালা আমাকে ডেকে নিল। একশো টাকা চেয়েছিল বলে আমি বললাম – বেশি হয়ে গেল না ভাই। ও অম্লান বদনে বলল – একটুও না। তারপর যা যা গল্প বলতে বলতে প্রদর্শনী দেখাতে নিয়ে এল তাতে মনে হচ্ছিল মানুষটা টাকাটা কমই চেয়েছে।

পৌঁছেই ঢুকে পড়লাম শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত হল ঘরে। সামনেই ছিল ঈশিতা, কৃষ্ণজিৎ-এর সবচেয়ে বড়ো বন্ধু ও সহধর্মিনী। এক মুখ হাসি দিয়ে আপ্যািয়ন করল। হলের এ-মাথা থেকে ও মাথা শুধু কৃষ্ণজিৎ-এর আঁকা ছবি। কোনোটা ক্যা নভাসে আঁকা ফ্রেম ছাড়া তো কোনোটা সুন্দর করে বাঁধানো। দরজা দিয়ে ঢুকেই ডানদিকের দেওয়ালে রবি ঠাকুরের ছবি – ভাসমান নৌকায় দাঁড়িয়ে একাকী কবি। কিন্তু ছবিতে একটুও নীল বা সবুজ নেই। হলুদ রং – যেন আলো হয়ে জ্বলছে ছবিতে। আর বাঁয়ে ঘুরতেই সেই সেতারবাদকের হাতজোড়া। সেতারের থেকে পাতা বেরিয়ে আসছে। তার পাশেই মাঠের উপর একা শুয়ে থাকা একটি বাদ্য্যন্ত্র – এসরাজ। ওদিকে নৃত্যে ভঙ্গিমায় বাঁকা খেজুর গাছে রস ধরতে হাঁড়ির বদলে দোতারা বাঁধা। সুরের রস ঝরছে বুঝি গাছ দিয়ে। আছে মোহিত হয়ে গান করা সেই রাখাল ছেলের অবয়ব। হারমোনিয়ামের ছবি, যেটা গানের সুর তুলে বুড়ো হয়ে গেছে কিন্তু তবু নতুন সুরের আবাহন বন্ধ করতে পারে নি। ছিল কৃষ্ণজিৎ-এর সহজাত ঢঙে আঁকা বাউল-সিরিজের কয়েকটি ছবি আর তাদের সঙ্গে কিংবদন্তি সব গায়ক, বাদক, সুরস্রষ্টাদের পোর্ট্রেট। কবি নজরুলের ওইরকম মুখচ্ছবি আমি আগে দেখিনি, মানে ওরকম অভিব্যরক্তি।

কৃষ্ণজিৎ আর প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান সূত্রধর যৌথভাবে অনুষ্ঠানটির আয়োজক।  কৃষ্ণজিৎ বিগত কয়েক বছর ধরেই ‘সূত্রধর’-এর অসংখ্য বইয়ের কাজ করে চলেছে। ওদের সেই যৌথতার ফসল স্বরূপ নতুন বই ও সিডিটিও প্রদর্শনীর শুরুতেই প্রকাশ করলেন সুধীর চক্রবর্তী ও শ্রীকান্ত আচার্য।

শ্রীকান্তদা আর সুধীর বাবুর ‘গান নিয়ে গল্পগাছা’-র আগে কৃষ্ণজিৎ-এর বলা মুখবন্ধ প্রদর্শনীর মেজাজ এনে দিল। আমার চিত্রকর বন্ধুটি এখন ভালো বক্তাও বটে। সে জানালো বাঙালি কেন গানপাগল আর ছবিপাগল জাতি আর কবে থেকেই বা তার এই পাগলামির শুরু। এই নিয়ে আমি কত বার বিতর্ক করেছি ওর সাথে। আজ ও বিতর্কের উর্দ্ধে। মা গান গেয়ে ছেলেকে ঘুম পাড়ায়, মাঝি গান গেয়ে জীবন নদীতে দাঁড় বায় আর মৃত্যুেতে – সবকিছু শেষ হবার পরেও গান আছে বাঙালির। বাংলার মাটি, জল, গাছ, ফুল, পাতা, পাখি, আকাশ ও মানবমনে যে গান আছে চিত্রকর যেন সেটাকেই ছবিতে ধরতে চায়। জানতামই না বিভিন্ন রাগের জন্যও নানা রং ব্যাবহারের প্রচলনও আছে। আর কৃষ্ণজিৎ গত পনেরো বছর ধরে গান, সুর আর তার ছবি এঁকে চলেছে – ভাবা যায়! কতবার ছোট ছোট ছবি উপহার পেয়েছি ওর কাছ থেকে। সবই ডিকন্সট্রাকশান অথবা হয়তো রিজেনারেশন – একটা বিশ্লেষিত হয়ে আরেকটার আবির্ভাব হচ্ছে। এখানেও যেন তাই।

শ্রীকান্তদার সাথে সুধীর বাবুর মনোজ্ঞ আলোচনা জমিয়ে দিয়েছিল সভা আর প্রদর্শনী। কথায় আর গানে মিশে গেল সেই আলোচনা। শ্রীকান্তদাকে সুধীরবাবু বেশ কিছু তীক্ষ্ণ প্রশ্ন করেছিলেন। কে গায়ক, কে পারফর্মার আর কে আর্টিস্ট বা শিল্পী ? শ্রীকান্তদা সরাসরি উত্তর দিতে পারেননি। যদিও অভিজ্ঞতা দিয়ে কিছুটা বোঝালেন।  তিনি দুজন শিল্পীর কথা বললেন – ক্লাস টুয়েলভে পড়ার সময় সেলিম চিস্তির সমাধিস্থলে যে গায়ককে পেয়েছিলেন তাঁর কথা স্মরণ করলেন। স্মরণ করলেন অশক্ত অসুস্থ প্রতিমা বন্দোপাধ্যাায়কে যিনি ‘আঁধার আমার ভালো লাগে’ গেয়ে সবার চোখে জল এনে দিয়েছিলেন। সুধীরবাবু পরে অবশ্য নিজেই এই প্রশ্নের ভারি সুন্দর করে উত্তর দিলেন। গায়ক যিনি তিনি নিভৃতেও গান করেন। পারফর্মার শ্রোতা অন্ত প্রাণ। তাঁরা মজলিশের পরিবেশ ও দাবী অনুযায়ী গান গেয়ে চলেন। আর শিল্পী পরিবেশ সৃষ্টি করেন।  তাঁদের আলোচনা থেকেই জানলাম রবীন্দ্রসংগীত প্রায় ২১০০ মত আছে যার মধ্যে্ ১৮০০ টির মতো স্বরলিপি পাওয়া যায়। কিন্তু মাত্র ১০০-১৫০টি গানই ঘুরে ফিরে শোনা যায়।  কাজেই রবীন্দ্রসঙ্গীতের চর্চার যে গর্ব সঙ্গীতকারেরা করেন তা যে এক প্রকার বুজরুকি – সেকথা দুজনেই মানলেন। এছাড়া রবীন্দ্রগানের চর্চার নামে অন্যক ঘরানার গান বড়োই বঞ্চিত হয়েছে। এ’কথাও তারা মানলেন।  আমি মুগ্ধ হয়ে শুনছিলাম আর অবাক হচ্ছিলাম – গানের পিছনে এই কথাগুলি ছবির প্রদর্শনী দেখতে না এলে শুনতে পেতাম না।

২২ তারিখ শনিবার অনুষ্ঠানে যাইনি। তবু মন পড়ে ছিল সেখানে। আসলে আমার সহধর্মিনী অনিতা আর মেয়ে ঐশিকী ২৩ তারিখ কবীর সুমনের কথা শুনতে চাইছিল আর তাই মেয়েকে সন্ধেবেলা পড়া দেখানোর জন্য২ ২২ তারিখে অনুষ্ঠানের লোভ ত্যা গ করতে হল। মিস্ করলাম আগরপাড়ার বন্ধু অনন্ত আর প্রতীমকেও – ওরা সেদিন গিয়েছিল।

২৩ তারিখ সভায় সময়মতো পৌঁছে গেলাম। খানিক্ষণ বাদে কবীর সুমনও উপস্থিত হলেন। খুবই খারাপ লাগল সুমনদার অশক্ত পদচারণা দেখে। উনি ঘুরে ঘুরে সব ছবি দেখলেন। আমি পর পর ছবি তুলছিলাম সেই ঐতিহাসিক সময়ের। আমার মেয়েও পাশে পাশে ঘুরছিল। তারও বেশ কিছু ছবি উঠে গেল সুমনদা আর কৃষ্ণজিৎ-এর সঙ্গে।

এরপর কৃষ্ণজিৎ আর কবীর সুমনের আড্ডা শুরু হল।  সুমনদার কাছে কৃষ্ণজিৎ-এর প্রথম প্রশ্ন ছিল – গানে সুর বসাতে গিয়ে অথবা সেই গান গাইবার সময় কোনও ছবি সুমনদার মনে ভাসে কি না। কবীর সুমন প্রথমটায় অস্বীকার করলেন – অর্থাৎ মনে ছবি ভাসে না।  কবীর সুমন বলছিলেন – গানের কথা একটি ছবির ভাবনা ছড়ায়, কিন্তু সুর নয়। বলেছিলেন গানে সুর বসানোর সময় তিনি সেই সুরে নিজেই প্রবেশ করেন। যেন এটা এখানে ওটা ওখানে সাজানোতে এত ব্য্স্ত থাকেন যে ছবি তার মাথায় ভাসে না। আমার মানতে ইচ্ছা করে নি, কারণ তিনি যে সুর দিয়ে গান বাঁধেন অর্থাৎ প্রতিমাটি সাজান সেটারও একটা ছবি তার মনে কোথাও নিশ্চয় ভাসে। তাঁর কি ঝরনার আওয়াজ শুনে জলজ ছবি মনে ভাসবে না! তাঁর কি বাঁশির আওয়াজ শুনে একলা বালকের ছবি মনে জাগবে না! তিনি বললেন বিদেশে – বোধহয় জার্মানিতে গান নিয়ে ছবির ভাবনা হয় – এদেশে নয়। আরে এই পোড়া দেশে এমন একটি আলোচনা পাওয়াটাই তো ভাগ্যেকর কথা – তো নানা শিল্প-কলার সমন্বয় ভাবাই যাবে না। সুমনদাও মানলেন – এটা শিল্পীদের আত্মম্ভরিতা। তবে উনি কৃষ্ণজিৎ-এর সুর নিয়ে ছবি আঁকার আবেগটিকে কখনও আহত করছিলেন না বরং কথা বলতে বলতেই ওর আঁকা নানা ছবির ব্যা খ্যার করছিলেন, সরগমও করছিলেন। তার মতো একজন গায়ক, গীতিকার, সুরকার যখন সুরের ছবির অর্থ বিশ্লেষণ করেন সেটা নিশ্চয়ই একটা অন্যএ মাত্রায় পৌঁছোয়। কৃষ্ণজিৎ খুবই ভাগ্যিবান এক্ষেত্রে। ভাগ্যকবান আমিও। আমার মেয়ে আর আমার সহধর্মিনীও – এসব চাক্ষুষ দেখা আর শোনার সুযোগ হল ওদেরও।

অবশেষে কৃষ্ণজিৎ সুমনদার সুরারোপিত ‘পেটকাটি চাঁদিয়াল’ গানের ইন্টারলুড মিউজিকে যে ছবি ফুটে উঠে তার ব্যা খ্যার দেওয়ার পর পুরোই বদলে গেল ‘গানের সুরে ছবি’ নিয়ে সুমনদার মতামত। এরই মাঝে এক গবেষক শিক্ষয়িত্রী দর্শকাসন থেকে বলতে চাইলেন ‘সুর বিমূর্ত’। কিন্তু ততক্ষণে সুমনদা অন্যগ এক স্তরে পৌঁছে গেছেন। তিনি বিমূর্ততার কথা জোরের সঙ্গে অস্বীকার করলেন আর তৎক্ষণাৎ গান গেয়ে বুঝিয়ে দিলেন ‘সুর জীবন্ত আর তার ছবিও হয়’।

কবীর সুমনের আলোচনার পরে বাঙলার পুরাতনী গানের আসর বসেছিল সভাঘরে। বিশ্বাস করুন, কারোকে অসম্মান না করেই বলছি – সেই পরিবেশনা সুমনদার কথা শোনার পরে নেহাতই সাদামাঠা ।

আমি বাইরে এসে দেখলাম কবীর সুমন অন্য দের সঙ্গে গল্পে মশগুল। গায়ক, চিত্রকরদের তুলনামূলক রোজগার, দর্শকের কাছে তাদের দামের তুলনা এসব কথা এসেই যাচ্ছিল আলোচনার সময়। বাস্তবতার কারণেই – ছবি দাম দিয়ে কিনতে হলে একজন উপভোক্তাকেই সবটুকু দাম দিতে হয়, যেটা গান শোনার ক্ষেত্রে হয় না। তাছাড়াও সংগৃহীত ছবি সংরক্ষণের জন্যক উপযুক্ত জায়গার অভাব ছবি কেনাকে প্রায়ই বিলাসিতার পর্যায়ে নিয়ে যায় ।

গ্যা লারির বাইরে উদ্যারনের চেয়ারে বসে আরো কতসব কথাবার্তা হচ্ছিল। গান গাইতে হলে রেওয়াজ পরিশ্রম করতে হয় – অথচ ছবিতো যে কেউ আঁকতে পারে এই মনোভাব – চিত্রকরের দাম কমিয়ে দিচ্ছে। বাইরে সুমনদার পাশে দাঁড়িয়ে এইসব আলোচনা শুনছিলাম।

সূত্রধর ও কৃষ্ণজিৎ-কে ধন্য বাদ আমাদের সকলকে এমন সুন্দর একটা অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের সুযোগ করে দেওয়ার জন্য।

অনন্ত সুরের ছবি
তুহিনশুভ্র

গান আর ছবির সম্পর্ক চিরদিনের। শব্দ দিয়ে তৈরি দৃশ্যকল্প বা ইমেজারিকে সুরের আসন পেতে দিতে হয় গানে। আবার রঙের পরতে পরতে সুরের আলো-আঁধারি সঠিক ভাবে ফুটিয়ে তুলতে না পারলে সে ছবি ইম্ব্যালান্সড্, ডিস্টিউন্ড্। কেননা সুরের আরেক অর্থ আলো।

সুর ও ছবির হাত ধরাধরিতে ‘বাংলার সুর, সুরেলা বাঙালি’ শীর্ষক এক অভিনব প্রদর্শনী হয়ে গেল নিউটাউন রবীন্দ্রতীর্থর প্রদর্শনী কক্ষে গত ২১ থেকে ২৩ জুন, ২০১৯। ছবি ও সুরের পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ে গান-গল্প-আলোচনায় উপস্থিত ছিলেন শ্রী সুধীর চক্রবর্তী, শ্রী শুভেন্দু মাইতি, শ্রীকান্ত আচার্য, প্রত্যুষ বন্দোপাধ্যায় এবং কবীর সুমনের মতো প্রাজ্ঞ ব্যক্তিবর্গ। বাদ যাননি বিশিষ্ট শিল্প-সমালোচক মৃণাল ঘোষের মতো ব্যক্তিত্বও।

প্রদর্শনী কক্ষে প্রবেশ করে বাঁদিক থেকে শুরু করলে প্রথমেই যে ছবিটি চোখে পড়ে তার নাম নিখিলধ্বনি। ক্যানভাস জুড়ে একটি সেতারকে পরম আদরে ধরে আছে দুটি অলৌকিক হাত। শিল্পীর মুখচ্ছায়া এ ছবিতে অনুপস্থিত। গভীর মগ্নতায় ক্যানভাসে কান পাতলে হয়ত শোনা যেতে পারে নিখিল ব্যানার্জীর আঙুল-ধোয়া কোনো এক সন্ধের রাগ। আরেকটি ছবিতে দেখা যায় একটি হেলে পড়া খেজুর গাছে দোতারার আলিঙ্গন। এ যেন ঠিক ‘রসিক জানে রসের সন্ধান’- এর চিত্ররূপ। দোতারা এখানে আর নিছক কোনো লোকায়ত বাদ্য নয়, সে যেন খেজুর রস সংগ্রাহক শিউলিরূপী দুনিয়ার রসিকজনের সম্যক প্রতিরূপ। আর একটি ছবিতে দেখা যায় এক জরাক্লীষ্ট, জীর্ণ হারমোনিয়াম যার সাদা-কালো রিডগুলো অপুষ্ট শিশুর পাঁজরের হাঁড়ের মতো কাতর অথচ তীব্র। হারমোনিয়ামের বেলোর ফুটো থেকে গজিয়ে উঠেছে একগোছা রজনীগন্ধা। সে রজনীগন্ধার মৃদু গন্ধের ছায়া লেগেছে আকাশের গায়ে অনাদরে ঝুলে থাকা কবেকার বুড়িচাঁদে। এই ছবিটি বর্ণ-গন্ধ-ছায়ায় গাঁথা যথার্থই একটি আস্ত গান যার অন্তরে অনন্ত সুরের সুতো।

একটি লক্ষ্যনীয় বিষয় হলো– সেতার, দোতারা ও হারমোনিয়াম এই তিনটি ছবির ব্যাকগ্রাউন্ডেই সাদা ও কালো রঙের একে-অপরের প্রতি বৈরিতা কিংবা সহাবস্থান। দুটি বিপরীত রঙ থেকে তৈরি হওয়া দ্যোতনা এক মহাজাগতিক শূন্যতার আভাস আনে। আর সেই নির্ভেদ্য অসীম শূন্যতাই তো আসলে শব্দব্রম্ভ বা প্রকারান্তরে আদি সুরের গর্ভগৃহ।
ভাটিয়ালি নামের ছবিতে দেখা যায় বেশ কয়েকটি নৌকো দরিয়ার বুকে ভেসে চলেছে। ছবিটিকে দেখা হয়েছে ওপর থেকে, যাকে ছবির ভাষায় বলা হয়ে থাকে ‘হক-আই’ ভিউ। জীবন-নদীর বুকে ভাসমান কায়াতরীর যে সুস্পষ্ট গতি, শৃঙ্খলা, ভারসাম্য এ ছবিতে দেখা যায়, তা ভাটিয়ালী সুরের কাঠামোগত চলনটিকেই কিন্তু নিখুঁতভাবে ইঙ্গিত করে। আধা রিয়েলিস্টিক, আধা অ্যাবস্ট্রাক্ট ফর্মে আঁকা মগ্ন সরোদশিল্পীর যে ছবিটি, তার নাম আহির-ভৈরব। রাগ-মাধুর্যের নিয়ম মেনে ভোরের স্নিগ্ধতাটুকু ছাড়া এ ছবিতে অহেতুক রঙের বিচ্ছুরণ আসেনি। এ ছবির প্রতিটি রেখা যেন মন্দ্রসপ্তকে বাঁধা, আর তার চলন আহির-ভৈরবের দুটি উল্লেখযোগ্য স্বর কোমল রেখাব ও কোমল নিষাদের মতোই নরম, মৃদু।
নৌকোর পাটাতনে দণ্ডায়মান একাকী রবীন্দ্রনাথ ছবিটিও আলাদা ভাবে উল্লেখের দাবি রাখে। এ ছবির আকর্ষণ দর্শকমনে নেহাত কম নয়, যদিও ছবিটির কম্পোজিশনগত একটু-আধটু বিচ্যুতি চোখে পড়লেও পড়তে পারে। প্রদর্শনীকক্ষের প্রায় অর্ধেক জুড়ে রয়েছে নানান সংগীত-সাধক ও খ্যাতিমান ব্যক্তিত্বের পোর্ট্রেট। যাঁরা শিল্পী কৃষ্ণজিতের পোর্ট্রেট সম্পর্কে অবহিত, তাঁরা জানেন পোর্ট্রেট আঁকার দক্ষতায় তিনি কোন উচ্চতায় বিরাজ করেন। যদিও প্রদর্শনীর কয়েকটি পোর্ট্রেটে শিল্পীর সেই স্বকীয় দ্যুতি ম্রিয়মান। তার প্রধান কারণ বোধহয় খুব কম সময়ের ব্যবধানে অতিরিক্ত পোর্ট্রেট আঁকার তাগাদা। এবার আসা যাক প্রদর্শনীর সেই ছবির প্রসঙ্গে, আঙ্গিক-স্বকীয়তা ও নান্দনিক কৌলিন্যের কারণে যার স্থান হয়েছে আমন্ত্রনপত্র-ব্রোশিয়রের প্রচ্ছদে। দিগন্তজোড়া শস্যখেত, ঠিক তার মাঝখান দিয়ে এয়োতির সিঁথির মতো একটি ছড়হীন এস্রাজ চলে গেছে বহুদূর। ও-প্রান্ত প্রায় দেখাই যায়না, আর ঠিক সেখানে, যেখানে মেঘকালো আকাশ দিগন্ত ছুঁয়েছে, সেখানে এক নির্জন পথিক ছাতা মাথায় পিছন ফিরে দাঁড়িয়ে। কে ওই পথিক? কেনই বা সে মুখ ফিরিয়ে রয়েছে? পথিক কি নিজেই যন্ত্রী, নাকি পড়ে থাকা যন্ত্রের দ্বিতীয় সত্ত্বা? একবুক অভিমান নিয়ে প্রাণের বাদ্যখানি ফেলে রেখে সে আজ কোথায় চলেছে? অনন্ত সুরের খোঁজে? কেমন সে সুর? আলোর মতো! তবে এই পথিক কি সেই আলোর পথযাত্রী? চিত্রশিল্পী জানবেন নিশ্চয়!

Posted in Cultural journey | Tagged , , , , , , , , , , , , , | 2 টি মন্তব্য

মুক্তিযোদ্ধা

Posted in Cultural journey | Tagged , | এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান

কৃষ্ণজিৎ-এর কলাম ৫ : শুভাপ্রসন্ন

শহর হিসেবে কলকাতা খুব একটা পুরোনো নয় মোটেই। তার চেয়ে ঢের প্রাচীন জনপদ এদেশে অনেক আছে। তবুও কলকাতার গুরুত্বের কোনো তুলনা হয় না। এতবেশি ঘটনা ও গুণীজনের ব‍্যক্তিত্বের বিকাশ খুব কম শহরকে ঘিরেই হয়। কলকাতাকে নিয়ে কত কবিতা, ছবি, গান, চলচ্ছবি গড়ে উঠেছে। অনেকেই জানেন যে আমার প্রিয় বিষয় হল চিত্রকলা। আর তাই ছবির কলকাতা ও কলকাতার ছবির প্রতি খুবই আগ্রহী আমি। কলকাতা শহর ও তার লোকজনকে নিয়ে দেশ-বিদেশের কত শিল্পীর আঁকা ছবির বই-পত্রিকা যে আমার সংগ্রহে আছে। মাঝেমাঝে সেগুলো ঘাঁটতে বসে বেশ উৎফুল্ল বোধ করি। এই তো আজই হঠাৎ করে Calcutta Black And White নামে চমৎকার একটি ছবির বই দেখছিলাম। এটি আসলে ১৯৯০-এ শিল্পী শুভাপ্রসন্নর একক প্রদর্শনী উপলক্ষে প্রকাশিত একটি ক‍্যাটালগ। শুভাপ্রসন্নের সঙ্গে আমার কোনো ব‍্যক্তিগত পরিচয় নেই। কিন্তু আমি তাঁর ছবির দীর্ঘদিনের গুণগ্রাহী। জানি এই শিল্পীর নাম শুনলেই অসংখ্য মানুষের ঠোঁটে ফুটে ওঠে ঘৃণা ও তাচ্ছিল‍্যের হাসি। কিন্তু আমি নিশ্চিত সেইসব মানুষেরা বেশিরভাগই শুভাপ্রসন্নের আঁকা একটিও ছবি ভালো করে দেখেননি। আসলে বেশিরভাগ লোকে চলতি হাওয়ায় ভেসে নিন্দের জন‍্যই নিন্দে করে বেড়াতে বড়ো ভালোবাসে।

যাক সে কথা, শুভাপ্রসন্নের কলকাতা-সিরিজের ছবির কথায় আসি। এই বইটিতে চোদ্দটি সাদাকালো ছবি আছে। সেইসব ছবিতে কলকাতার বিচিত্ররূপ দেখলে তাক লেগে যায়। এমনিতেই শুভাপ্রসন্নের ছবি দক্ষতানির্ভর। সম্ভবত দক্ষতার কারণেই তাঁর চিত্রকল্প খুব সহজেই আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। তার সঙ্গে অবশ্য শিল্পীর মেধার প্রয়োগও অনবদ‍্য। যেমন একটি ছবিতে নরমুণ্ডের মালা গলায় মা কালির সামনে মুণ্ডহীন ভক্তবৃন্দের সমাবেশ বুঝিয়ে দেয় উপাস‍্য আর উপাসকের মধ্যেকার প্রকৃত সম্পর্কটিকে। একই দ‍্যোতনা দেখা যায় তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রীর ট্রামসফর উপলক্ষে চোখবাঁধা মানুষের সমাগমের দৃশ্যে।এইরকম ব‍্যঙ্গাত্মক ছবির পাশেই রয়েছে সম্মানিত সত‍্যজিৎ রায়-এর অপূর্ব এক উপস্থাপনা। অপু-দুর্গা ও কাশবনের প্রেক্ষাপটে ধাবমান রেলগাড়ির মাঝখানে দাঁড়িয়ে ফ্রান্সের সর্বোচ্চ সম্মান গ্রহণ করছেন সত‍্যজিৎ। শুভাপ্রসন্নের বিখ্যাত কাকেরাও রয়েছে শহর কলকাতার ক‍্যানভাস জুড়ে। এইসব ছবি দেখতে দেখতে কতসব অনুভূতির জন্ম হয়। এক আধুনিক শিল্পীর চোখ দিয়ে কলকাতাকে দেখার এই যে অপূর্ব আয়োজন, জানি না তার কথা ক’জন মনে রেখেছেন? তবে কি ব‍্যক্তি শুভাপ্রসন্নের কুখ‍্যাতি শিল্পী শুভাপ্রসন্নের সমস্ত প্রতিভাকে কি ঢেকে দিল শেষপর্যন্ত? হায়!

Posted in Cultural journey | Tagged , , , | এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান

কৃষ্ণজিৎ-এর কলাম ৪ : জীবন-শিল্প

জীবনের সঙ্গে শিল্পের যোগ না থাকলে সব আয়োজন ব‍্যর্থ হয়, একদা একথাটা বইয়ে পড়েছিলাম। বড়ো হয়ে উঠে আমার অভিজ্ঞতাও ইদানীং সেই কথাটাই বলতে চায়। এখন দেখি আমার চারপাশে কেউই আর নিজের দেশ, পরিবেশ, ইতিহাস, সংস্কৃতিকে ভালোবাসে না। প্রশ্ন করলে উত্তর দেয় ‘কিভাবে হবে, সময়ই তো পাই না।’ দেখেশুনে মনে হয় এমনই অবস্থা যে কেউ একফোঁটা অবসর পায় না। সারাক্ষণ উপার্জনের চিন্তাতেই মত্ত। মনে হয় সকলেই এত কম রোজগার করে যে অন্নের চিন্তায় আর অন্য কোনো কিছুতে মন দিতে পারে না। কিন্তু এত ব‍্যস্ততা সত্ত্বেও সংস্কৃতি কিন্তু অন‍্যপথে দিব‍্যি বিকশিত হয়ে চলেছে, হয়েই চলেছে। পরিবারগুলোতে কতকাল ভালো কোনো গান বাজে না, সুন্দর ফিল্ম দেখা হয় না সবাই মিলে। শেষ কবে চমৎকার একটা বই পড়ে আমোদিত হয়ে সংসারের কর্তা কর্ত্রীকে তার কথা বলেছেন কেউ জানে না। ভ্রমণ আছে নিশ্চয়ই, কিন্তু নেই কোনো হাতে তৈরি অ‍্যালবাম। ফলে মাঝেমাঝেই ‘ফরম‍্যাট’ করতে গিয়ে চিরতরে হারিয়ে যায় সতত সুখের স্মৃতি। কী অদ্ভুত জীবন এসে পড়ল আমাদের মাঝখানে! ছেলেমেয়েরা বাংলায় পড়াশোনা করতে পারে না, ইংরেজিতেও পারে কিনা জানি না। আসলে পড়াশোনা তো চাকরি খোঁজার জন্য। পুলিশ যেমন চাকরি পেলেই নিজের শরীরের সুগঠনের কথা ভুলে গিয়ে মহানন্দে মধ‍্য-প্রদেশ বাড়িয়ে ফেলে, তেমনিই মানুষের সমস্ত পড়াশোনার শেষ হয় চাকরির অ‍্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার হাতে পেলেই। সমস্ত শিক্ষার একমাত্র লক্ষ্য মাসান্তে বেতন গোনা। বয়স্কদের বিলাপ, প্রৌঢ়দের আক্ষেপ আর মধ‍্যবয়স্কদের পাকামির দৌলতে যৌবন এখন বেপরোয়া। সে বিশ্বাস করে না কোনো শেকড়ে। তাই সে পকেটে ডেবিট ও ক্রেডিট কার্ড নিয়ে বেনোজলে কচুরিপানার মতো মহানন্দে ভেসে বেড়ায়। রাস্তার কলে জল পড়ে নষ্ট হয়ে গেলে বন্ধ করতে আসে না কেউ, পাড়ার পুকুর নোংরা জমে ভরাট হয়ে উঠলে কারো মাথাব‍্যথা করে না। যেকোনো উৎসবে গাঁকগাঁক করে গান বেজে উঠলে সমবেত মানুষ অখুশি হয়েও সেই প‍্যান্ডেলে ঠাকুর দেখতে যায়। ছেলে-মেয়েকে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে ভর্তি করে হোয়াটসঅ্যাপে একুশে ফেব্রুয়ারির দিন কত সুখে ভাষাপ্রেমের স্ট‍্যাটাস দেয়।

কি জানি, মানুষ হয়ত আসলে এইরকমই। দু’চারটে বিদ‍্যাসাগর,রবীন্দ্রনাথ, বিবেকানন্দ, দেবব্রত মুখোপাধ্যায়, শঙ্খ ঘোষ-এর মতো মহাপ্রাণের কথা জেনে আমিই বোধহয় ভুল ভেবেছিলাম। অবিরাম স্ববিরোধ বুকে পুষে কোথায় চলেছে আমাদের পরিপার্শ্ব, আমি নিজেই বা চলেছি কোথায়?

তাই মনে হয় জীবনের সঙ্গে জীবনেরই আর কোনো যোগ নেই এখন।

তবুও সকালবেলার শান্ত সৌন্দর্য এখনও সুন্দর। পাখির পালকের নরম লাবণ‍্য, নদীর জলের অবিরাম বয়ে চলা, অথবা মায়ের হাত ধরে টলমলে পায়ে হেঁটে চলা শিশুটিকে দেখতে পেলে আজও আনন্দ হয়। সুখ হয় প্রিয় শিল্পীর ছবির কথা ভাবতে, ক‍্যানভাসজুড়ে তুলির আশ্চর্য চলাচল, এইসবই তো আসল সৌন্দর্য। ভালো লাগে ভোরের মাঠে প্রবীণ-প্রাণের হেঁটে যাওয়া দেখতে। কোথাও আশা আছে কি নেই, সেকথা আর মনে পড়ে না। চায়ের ভাঁড়ের উষ্ণতায় যে মাধুর্য, সেইটুকু নিয়েই চুপচাপ বসে থাকতে ভালো লাগে। ছোট্ট একটা জীবন, মহাকালের বিচারে কতটুকুই বা সময়! তাকে অতিক্রম করে যাওয়া কি খুব কঠিন কিছু?

Posted in Cultural journey | Tagged , , , | এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান